ভেনেজুয়েলার আটককৃত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তাকে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। মার্কিন সিনেটর মাইক লি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যকার এক আলোচনার পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদুরো এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনো নতুন সামরিক হামলার প্রয়োজন নেই। মূলত দেশটির বিতর্কিত নেতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগেই এই নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে সিনেটর মাইক লি জানান, ভেনেজুয়েলার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে বিস্তারিত কথা বলেছেন। রুবিও তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা এবং সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। সিনেটর লি লিখেছেন, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন যে নিকোলাস মাদুরো এখন মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি এবং তাকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। গতকাল মধ্যরাতে কারাকাসে যে বিশেষ সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল, তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মাদুরোর বিরুদ্ধে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা এবং অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।”
মার্কিন বিচার বিভাগ ও অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডির দেওয়া তথ্য অনুসারে, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ইনডিক্টমেন্ট) দাখিল করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আনা প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্র বা ‘কার্টেল অফ দ্য সানস’-এর নেতৃত্ব দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম অবৈধভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, মাদুরো দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভেনেজুয়েলাকে একটি মাদক সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন এবং সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রকে সহায়তা দিচ্ছিলেন।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২০ সালেই ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে মাদুরোর বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল এবং তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ২০২৬ সালের এই বিশেষ অভিযানটি মূলত সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আইনি প্রক্রিয়ারই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ নিশ্চিত করেছে যে, এই ঝটিকা অভিযানে অংশ নিয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর অত্যন্ত দক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’। কোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানি ছাড়াই এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনটি সম্পন্ন হয়েছে বলে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর এখন ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব দেশটির জনগণের। যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি কোনো হামলার পরিকল্পনা না রাখলেও ভেনেজুয়েলার ডেমোক্রেটিক রূপান্তরের ওপর নজর রাখবে। মাদুরোকে আটকের পর তাকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘আইও জিমা’র মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে তাকে সরাসরি নিউ ইয়র্কের আদালতে হাজির করা হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের ঘটনার সাথে তুলনা করছেন। নোরিয়েগাকেও একইভাবে মাদক পাচারের অভিযোগে মার্কিন বিশেষ বাহিনী আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার করেছিল। এখন নিকোলাস মাদুরোর ক্ষেত্রেও একই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। এই ঘটনায় রাশিয়া ও চীন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও ওয়াশিংটন একে ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা’ ও ‘মাদক মুক্ত আমেরিকা গড়ার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্বের নজর এখন নিউ ইয়র্কের আদালতের দিকে, যেখানে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত এই বিচার প্রক্রিয়া।

