দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক শ্বাসরুদ্ধকর ও নজিরবিহীন সামরিক অভিযান চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার (৩ জানুয়ারি ২০২৬) ভোরে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় এই নাটকীয় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এই সামরিক পদক্ষেপটি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত মার্কিন হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবারের এই অভিযানের শুরুটা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। স্থানীয় সময় মধ্যরাত থেকে রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কারাকাসের আকাশসীমায় নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং বিশেষ করে ‘ফরচুনা’ ও ‘লা কার্লোটা’ সামরিক ঘাঁটির আশেপাশে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ভেনেজুয়েলা সরকার। তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউস থেকে আসা খবর বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পোস্টে দাবি করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত সফলতার সাথে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর ওপর একটি বৃহৎ পরিসরের হামলা চালিয়েছে। অভিযানে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড থেকে বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে।” ট্রাম্প আরও জানান যে, এই বিশেষ অপারেশনটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি এই ঘটনাকে ‘মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং আজ স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, এই দুঃসাহসিক অভিযানটি পরিচালনা করেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট স্পেশাল ফোর্স ‘ডেল্টা ফোর্স’। মূলত মাদক পাচার ও ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগে ২০২০ সাল থেকেই মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিল যে, মাদুরো সরকার আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের সাথে সরাসরি যুক্ত। তবে সামরিক অবকাঠামোতে সরাসরি হামলা চালিয়ে একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার এই অভিযানকে ‘ন্যাক্কারজনক সামরিক আগ্রাসন’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় অপহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক জরুরি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই ন্যাক্কারজনক হামলার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং এর তীব্র নিন্দা করছি।” মাদুরো প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্য চেয়ে বলা হয়েছে, মার্কিন এই পদক্ষেপ জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভেনেজুয়েলার ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন এবং ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করার মাধ্যমে যুদ্ধের দামামা বাজছিল অনেক দিন ধরেই। ট্রাম্প গত মাসেই মাদুরোকে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। কিন্তু মাদুরো সেই হুমকি উপেক্ষা করে গদিতে টিকে থাকার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি এই চরম সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।
বর্তমানে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে কোথায় রাখা হয়েছে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান জানায়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে যেভাবে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে বিচার করা হয়েছিল, মাদুরোর ভাগ্যও সম্ভবত সেই পথেই এগুচ্ছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া, চীন ও কিউবা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ নজির’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কারাকাসের রাস্তায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং দেশটির পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে এখন গোটা বিশ্ব উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছে।

