বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্ম কেবল নিজেদের ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়েই ভাবছে না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারের এক গভীর দায়বদ্ধতা থেকেও নিজেদের প্রস্তুত করছে। এমনই এক উজ্জ্বল ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণী শাকিবা হাসান তুশমি। আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি স্বপ্ন দেখছেন একজন দক্ষ ব্যারিস্টার হওয়ার, কিন্তু তার সেই স্বপ্নের পরিধি কেবল আদালত প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার এক মহৎ লক্ষ্য নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধীনে আইন বিষয়ে অধ্যয়নরত এই তরুণী বিশ্বাস করেন, মেধা, সততা ও সাহসিকতার সমন্বয়েই একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন সম্ভব।
শাকিবা হাসান তুশমির জন্ম ২০০২ সালের ৭ ডিসেম্বর, চাঁদপুরে তার নানাবাড়িতে। একটি সম্ভ্রান্ত ও সচেতন পরিবারে বেড়ে ওঠা শাকিবার বাবার নাম এম এম শাব্বির হাসান, যিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কর্মরত থেকে দেশের শুদ্ধাচার রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে তার মা সাবিহা সুলতানা বর্না একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পাশাপাশি একজন সমাজসচেতন নারী, যিনি দীর্ঘকাল ধরে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। দুই বোনের মধ্যে শাকিবা বড়। তার ছোট বোন সাবাবা হাসান রাইহা বর্তমানে রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা স্কুলের দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। শাকিবার পারিবারিক ঐতিহ্যেও রয়েছে শিক্ষার এবং জনসেবার ছাপ। তার প্রয়াত দাদা ছিলেন সরকারের একজন গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নানা চাঁদপুরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই পারিবারিক আবহ শাকিবার মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো এবং শিক্ষাজীবনের ভিত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে শাকিবা জানান, বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাসের অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। তবে ২০০৬ সালে তার পরিবার ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ওই বছরই তিনি স্কলাস্টিকা স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি। মেধার স্বাক্ষর রেখে ২০২০ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ‘ও-লেভেল’ এবং ২০২২ সালে ‘এ-লেভেল’ সম্পন্ন করেন। এরপর স্কলাস্টিকা থেকেই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। বর্তমানে তিনি লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ (এলসিএলএস-সাউথ)-এর মাধ্যমে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধীনে এলএলবি (অনার্স) দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। আইনের মতো একটি জটিল ও সম্মানজনক বিষয়ে পড়াশোনা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
তবে শাকিবার জীবনের লক্ষ্য শুরু থেকেই আইন পেশা ছিল না। ছোটবেলায় তিনি স্বপ্ন দেখতেন আকাশের বিশালতায় ডানা মেলার, হতে চেয়েছিলেন একজন অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এবং সমাজের অসঙ্গতিগুলো তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন, কীভাবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। অসহায় পরিবারগুলোর হাহাকার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। এছাড়া, বিভিন্ন সময়ে তিনি লক্ষ্য করেছেন, কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশের বিশিষ্টজন ও ভিন্নমতের মানুষকে টার্গেট করা হয় এবং তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলে। এসব ঘটনা তার কিশোর মনে গভীর দাগ কাটে। তিনি অনুধাবন করেন, সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। এই বোধ থেকেই তিনি প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে ব্যারিস্টার হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন, যাতে তিনি নিজেই একদিন শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেন।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শাকিবার রয়েছে এক বিশাল জগৎ। তিনি মনে করেন, একজন ভালো আইনজীবী হতে হলে কেবল আইনের ধারা মুখস্থ করলেই চলে না, বরং সমসাময়িক বিশ্ব ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। তাই প্রচুর বই পড়ার পাশাপাশি লেখালেখিতেও তার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ম্যাগাজিনে বিভিন্ন আর্টিকেল লিখে আসছেন এবং এখনো সময় পেলেই কলম ধরেন। লেখালেখির এই উৎসাহ তিনি পেয়েছেন তার মায়ের কাছ থেকে। সৃজনশীলতার পাশাপাশি নেতৃত্ব দানেও শাকিবা তার দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন। বর্তমানে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অ্যাডভোকেসি ক্লাব’-এর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ক্লাবের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, মুড কোর্ট (ছায়া আদালত) পরিচালনা এবং আইনি সচেতনতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম পরিচালনা তাকে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করছে।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শাকিবা হাসান তুশমি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ় প্রত্যয়ী। তিনি বলেন, “আমার প্রথম লক্ষ্য হলো আইন বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করা এবং একজন ব্যারিস্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে পরিবার ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করা। তবে এটি কেবল শুরু। পেশাগত জীবনে স্থিতিশীলতা আসার পর আমি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হতে চাই।” শাকিবা মনে করেন, আইন পেশা এবং রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক। একজন আইনজীবী যেমন আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারেন, তেমনি একজন রাজনীতিবিদ নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে সেই আইনকে জনবান্ধব করতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং আইন মান্য করার সংস্কৃতি তৈরিতে একজন আইনজীবীর রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা রয়েছে।
বিশেষ করে সমাজের অনগ্রসর অংশ—নারী, শিশু, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করার অদম্য ইচ্ছা রয়েছে শাকিবার। তিনি বলেন, “আমি এমন একটি সমাজ দেখতে চাই যেখানে টাকার অভাবে কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না। মানবিক ও মৌলিক অধিকারবঞ্চিত এবং অন্যায়ের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে আমি বদ্ধপরিকর।” নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়েও তার নিজস্ব ভাবনা রয়েছে। তিনি মনে করেন, একজন নারীর আত্মপরিচয় সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার মাধ্যমেই নারীরা সমাজে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেন।
শাকিবার এই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে একটি স্মরণীয় ঘটনা, যা আজও তাকে অনুপ্রেরণা জোগায়। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন বেশ লাজুক ও মৃদুভাষী। একবার সাহস সঞ্চার করে একটি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে মঞ্চে উঠে তিনি হঠাৎ ঘাবড়ে যান এবং কথা বলতে পারছিলেন না। সেই মুহূর্তে একজন বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে কিছু অনুপ্রেরণামূলক কথা বলেন, যা তার মধ্যে এক অদ্ভুত জাদুর মতো কাজ করে। বিচারকের সেই কথায় তার ভয় কেটে যায় এবং তিনি সাবলীল ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। সেই ঘটনাটি ছিল তার জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। এরপর থেকে তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন এবং নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। সেই দিনের সেই আত্মবিশ্বাসই আজ তাকে আইনের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় এবং রাজনীতির মতো বিশাল মঞ্চে পা রাখার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
শাকিবা হাসান তুশমির এই যাত্রাপথ প্রমাণ করে যে, একজন সচেতন তরুণের স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। তার মেধা, মনন এবং মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষে তার এই পথচলা সফল হোক, এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

