দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গাজা উপত্যকা ও মিসর সীমান্তবর্তী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ রাফা ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। গাজাবাসীর জন্য বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথটি খুলে দেওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো চাপ কাজ করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ক্রসিংটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল, যা গাজায় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘কান-১১’ এবং আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। আগামী সপ্তাহে তার দেশে ফেরার পরপরই ক্রসিংটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হতে পারে। জানা গেছে, নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ফেরাতে নেতানিয়াহুর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রাফা ক্রসিং বন্ধ রাখা কেবল ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজা উপত্যকার অবরুদ্ধ অধিবাসীদের জন্য রাফা ক্রসিং ছিল একমাত্র জানালা। এই পথ দিয়েই রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য মিসর হয়ে অন্য দেশে যেতেন এবং জরুরি খাদ্য ও ওষুধ গাজায় প্রবেশ করত। ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি সেনারা রাফা ক্রসিংয়ের গাজা প্রান্ত দখল করার সময় সেখানকার মূল ভবন ও অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে গত ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গাজার এই সীমান্তের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে চলে যায়।
দীর্ঘদিন এই পথ বন্ধ থাকায় গাজার হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া হলে অন্তত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং জটিল রোগীদের বাইরে যাওয়ার পথ সুগম হবে।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের অক্টোবর মাসে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি বড় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া। তবে ইসরায়েল নানা নিরাপত্তার অজুহাতে এতদিন চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেনি এবং ক্রসিংটির ওপর কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া বার্তা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ক্রমাগত উদ্বেগের মুখে ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে।
রাফা ক্রসিং খুলে দিলেও এর ব্যবস্থাপনা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে এখনও জল্পনা চলছে। ইসরায়েল চায় সেখানে আন্তর্জাতিক কোনো পর্যবেক্ষক দল বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) উপস্থিতি থাকুক, যাতে হামাস পুনরায় সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। অন্যদিকে, মিসর শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে যে ক্রসিংটির ফিলিস্তিনি প্রান্ত কেবল ফিলিস্তিনিদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া গাজা যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। এটি কেবল একটি সীমান্ত খুলে দেওয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আলোচনার পথেও একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নেতানিয়াহু ফেরার পর ক্রসিংটি কত দ্রুত এবং কোন শর্তে চালু করা হয়।

