বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে এক শোকাতুর পরিবেশের মধ্য দিয়ে নতুন বছরের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী এই নারী নেত্রী। মায়ের শেষ বিদায়ে গভীর শোক, শূন্যতা এবং দেশবাসীর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) এক আবেগঘন বার্তায় তিনি তার মায়ের বিদায়ে সৃষ্ট ব্যক্তিগত ও জাতীয় শোকের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, যা একই সাথে গভীর আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার স্বাক্ষর বহন করে।
তারেক রহমান তার বার্তায় উল্লেখ করেন যে, জীবনের প্রথম শিক্ষক এবং রাজনৈতিক আলোকবর্তিকা হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি তার কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি অত্যন্ত গভীর শোক ও পরম কৃতজ্ঞতার সাথে তার মাকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তারেক রহমান বলেন, একজন সন্তানের কাছে মায়ের চলে যাওয়া যেমন কষ্টের, তেমনি একজন রাজনৈতিক নেতার কাছে তার আদর্শিক অভিভাবককে হারানো তেমনই বেদনার। এই বিশাল শূন্যতা কোনো শব্দ বা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে এই কঠিন ও দুঃসময়ে দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত এবং অভূতপূর্ব উপস্থিতি তাকে একাকিত্বের হাত থেকে রক্ষা করেছে এবং মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের এই শোকাতুর অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি পরিবারের মা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে আসীন এক মাতৃতুল্য ছায়া।
জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে আসা অগণিত নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধার কথা স্মরণ করে তারেক রহমান গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের এই ভালোবাসা ও অশ্রুসজল বিদায় স্পষ্ট করে দেয় যে বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রাম ও ত্যাগ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য উৎসর্গ করা ছিল। সাধারণ মানুষের এই বাঁধভাঙা ভালোবাসা দেখে তার মনে হয়েছে, প্রিয়জন হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা ছাপিয়ে পুরো বাংলাদেশ আজ একটি বৃহৎ পরিবারে পরিণত হয়েছে। দেশবাসীর এই অকৃত্রিম সহমর্মিতা তাকে শোক কাটিয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে আরও দৃঢ়ভাবে কাজ করার প্রেরণা দিচ্ছে।
মায়ের বিদায়ে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তারেক রহমান কেবল দেশের মানুষের প্রতিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি, বৈশ্বিক কূটনীতিক এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই বর্ষীয়ান নেত্রীর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে আসা শোকবার্তাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন। তারেক রহমান জানান, এই বৈশ্বিক সংহতি ও সমবেদনা শোকাতুর পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ে সান্ত্বনার প্রলেপ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার যে অবদান ছিল, বিদেশের রাষ্ট্রনেতাদের এই শোকাতুর প্রতিক্রিয়া তারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারেক রহমান তার প্রয়াত পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং অকালপ্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের একের পর এক বিদায়ে তিনি নিঃসঙ্গতা অনুভব করলেও বাংলাদেশের মানুষের অদম্য ভালোবাসা তাকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। তার মতে, শহীদ জিয়া যেমন বাংলাদেশের আধুনিক রূপকার ছিলেন, তেমনি বেগম খালেদা জিয়া সেই ধারাকে সমুন্নত রাখতে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন। মা ও বাবার এই আদর্শিক উত্তরাধিকার এখন তার কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তিনি অনুভব করছেন যে, তার মায়ের যে কর্মযজ্ঞ বা দেশের মানুষের সেবার যে পথচলা থমকে গেছে, সেই পথযাত্রাকে সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া এখন তার প্রধান কর্তব্য।
তারেক রহমান অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে অঙ্গীকার করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া আজীবন যে মানুষের সেবা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে গেছেন, সেই ধারা থেকে তিনি বিচ্যুত হবেন না। তিনি মায়ের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ কাজগুলো বাস্তবায়নে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতি দেন। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসা বজায় রাখা এবং তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হবে তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যে শক্তি ও প্রেরণা নিয়ে লড়াই করেছেন, তা মূলত দেশের মানুষের কাছ থেকেই এসেছিল। তাই সেই মানুষদের অধিকার রক্ষা করাই হবে তার মায়ের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন।
পরিশেষে তারেক রহমান তার মায়ের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ যেন তার মায়ের রুহুকে শান্তি দান করেন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বেগম খালেদা জিয়া যে অসীম ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য ও উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা চিরকাল বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। সেই আদর্শ থেকেই দেশের মানুষ ঐক্য, দেশপ্রেম এবং সত্যের পথে চলার সাহস খুঁজে পাবে। মায়ের আদর্শকে ধারণ করে একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়ে তারেক রহমান তার বার্তা শেষ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই বার্তাটি কেবল শোকবার্তা নয়, বরং এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ এবং জনমানুষের সাথে দলটির এক গভীর আত্মিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ।

