রাজধানী ঢাকার রাজপথ আজ যেন এক মহাকাব্যিক শোকের দলিলে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা শেষে চিরবিদায় নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) তাঁর জানাজাকে কেন্দ্র করে ঢাকা আজ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির শহর নয়, বরং পরিণত হয়েছিল এক বিশাল বিলাপের নগরীতে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—রাজধানীর প্রতিটি অলিগলি আজ মিশে গিয়েছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সেই ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে, যেখানে লাখো মানুষ তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো আলবিদা জানিয়েছেন।
আকাশ থেকে তোলা ড্রোন ফুটেজে দেখা গেছে এক অভাবনীয় দৃশ্য। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে এই জনস্রোত শাহবাগ, ফার্মগেট এবং মহাখালী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই শোক সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং হৃদয়ের টান আর প্রিয় নেত্রীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাই আজ সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের করে এনেছিল। ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়েছে শোকাতুর মানুষের সেই মুখগুলো, যাদের কারোরই চোখ আজ শুকনো ছিল না।
লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে যখন বেগম খালেদা জিয়ার নিথর দেহ জানাজা স্থলে আনা হয়, তখন এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে পুরো এলাকায়। সেনাসদস্যদের কাঁধে চড়ে যখন তাঁর শেষ যাত্রা শুরু হয়, তখন লাখো মানুষের হাত দোয়া ও মোনাজাতের জন্য আকাশে ওঠে। স্থিরচিত্রগুলোতে ধরা পড়েছে সেই মুহূর্তগুলো, যেখানে কেবল রাজনৈতিক কর্মী নয়, বরং সাধারণ গৃহবধূ থেকে শুরু করে রিকশাচালক—সবাই প্রিয় নেত্রীর মাগফিরাত কামনায় শামিল হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেগম খালেদা জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মানের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিদেশি প্রতিনিধিদের সরব উপস্থিতিতে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকসহ ৩২টি দেশের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতরা জানাজায় অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেগম জিয়া ছিলেন এক অপরিহার্য ও নন্দিত ব্যক্তিত্ব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা এই বিদেশি মেহমানদের সঙ্গে শোক ভাগ করে নেন, যা দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রার যোগ করল।
বেগম খালেদা জিয়ার এই বিদায় কেবল একজন রাজনীতিকের প্রয়াণ নয়, বরং এটি একটি যুগের অবসান। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানকে হারানোর পর এক কঠিন সংকটের মুহূর্তে গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দলের হাল ধরেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ৪৩ বছরের লড়াইয়ে তিনি কখনো স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি, যার ফলে তিনি লাভ করেছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’র চিরস্থায়ী খেতাব। তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া এই মহীয়সী নারী তাঁর মার্জিত ভাষা ও ব্যক্তিগত আক্রমণমুক্ত রাজনীতির জন্য চিরকাল অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন।
৭৯ বছর বয়সী এই নেত্রী দীর্ঘকাল ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। অনেক বাধা ও আইনি লড়াই শেষে তিনি যখন চিরবিদায় নিলেন, তখন তিনি পুরোপুরি মামলা মুক্ত এবং জনগণের পরম শ্রদ্ধায় সিক্ত। বিকেলে যখন তাঁর মরদেহ স্বামী জিয়াউর রহমানের পাশে সমাহিত করা হচ্ছিল, তখন ক্যামেরা বন্দি হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ আর উত্তোলিত হাতগুলো যেন একথাই বলছিল—ব্যক্তি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলেও, তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামের স্মৃতি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। আজকের এই দৃশ্যপটগুলো কেবল সংবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য এবং আবেগঘন দলিল হিসেবে সংরক্ষিত রইল।

