প্রিয় নেত্রীর বিদায়ে যখন গোটা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে এক মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এক আবেগঘন পরিবেশের অবতারণা করলেন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে পরিবারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মায়ের ভুলত্রুটির জন্য উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং কোনো দেনা থাকলে তা নিজ কাঁধে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
জানাজার নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তারেক রহমান অত্যন্ত বিনম্র ও আবেগজড়িত কণ্ঠে উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, “আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। এখানে উপস্থিত সকল ভাই-বোনদের কাছে আমার একটি নিবেদন—আমার মা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালে যদি আপনাদের কারও কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, তবে দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি সেই ঋণটি পরিশোধের ব্যবস্থা করবো, ইনশাআল্লাহ।”
রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একজন সন্তানের এই আকুতি জানাজাস্থলে উপস্থিত লাখো মানুষের হৃদয়ে এক গভীর রেখাপাত করে। তারেক রহমান আরও বলেন, “দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমার মায়ের কোনো ব্যবহারে কিংবা কোনো কথায় যদি কেউ সামান্যতম আঘাত পেয়ে থাকেন, তবে তাঁর পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনারা আমার মাকে মাফ করে দেবেন।” এ সময় তিনি সবার কাছে মায়ের পারলৌকিক শান্তির জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, “আপনারা দোয়া করবেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।”
তারেক রহমানের এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবন এলাকায় এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। অনেক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। উল্লেখ্য, জানাজার এই আনুষ্ঠানিকতায় তারেক রহমানের সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে মরদেহ যখন গুলশানের বাসায় নেওয়া হয়, তখনও তিনি কফিনের পাশে বসে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন।
বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং দেশি-বিদেশি অসংখ্য কূটনীতিক ও শীর্ষ রাজনীতিবিদরা অংশ নেন। জানাজা শেষে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী ফ্রিজার ভ্যানটি রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলে শেরেবাংলা নগরের চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার এই প্রয়াণ এবং তাঁর ছেলের এই হৃদয়স্পর্শী আবেদন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বিরল ও মানবিক উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।

