রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানে এবার বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফার একটি বিশেষ শান্তি পরিকল্পনা আগামী জানুয়ারি মাসেই স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। গত রোববার ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের সাফল্য তুলে ধরে বুধবার জেলেনস্কি জানান, কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে শান্তি স্থাপনের এই খসড়াটি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার পথে রয়েছে।
জেলেনস্কি তাঁর ভাষণে বলেন, “ফ্লোরিডায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আমার আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা আশা করছি, ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যেই ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলো এই ২০ দফার প্রস্তাবিত নথিতে ঐকমত্যে পৌঁছাবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, শান্তি অর্জনে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা (Security Guarantee) অন্যতম প্রধান শর্ত এবং এ বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জানুয়ারিতে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই শান্তি চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্পের এই ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউক্রেনকে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান। খসড়া পরিকল্পনার ৫ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে, যুদ্ধের পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র আগামী ১৫ বছরের জন্য গ্যারান্টি প্রদান করবে। তবে জেলেনস্কি এই মেয়াদের বিষয়ে কিছুটা সংশোধনী চাইছেন। তিনি মনে করেন, রাশিয়ার মতো প্রতিবেশীর হাত থেকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই গ্যারান্টি ১৫ বছরের পরিবর্তে ৩০ থেকে ৫০ বছর মেয়াদী হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কিয়েভের প্রতিনিধিরা নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শান্তি চুক্তির পর ইউক্রেনে কেবল মার্কিন সেনাবাহিনীই নিরাপত্তা তদারকিতে অবস্থান করবে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি ইউক্রেনের আকাশসীমা সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ট্রাম্প। জেলেনস্কি জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ (Patriot Air Defense System) এবং ‘নাসামস’ (NASAMS) মিসাইল সরবরাহে সহযোগিতা করবে। রাশিয়ার সম্ভাব্য যেকোনো আকাশপথের হামলা ঠেকাতে এই ব্যবস্থাগুলোকে একটি ‘নিরাপত্তা প্রাচীর’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সরবরাহের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পুনর্গঠন নিয়েও এই শান্তি পরিকল্পনায় আশার আলো দেখা গেছে। জেলেনস্কি তাঁর বক্তৃতায় জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে কেবল সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী করতে চান। ‘সমৃদ্ধ ইউক্রেন’ (Prosperous Ukraine) প্যাকেজের আওতায় যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ইউক্রেনের অবকাঠামো এবং শিল্প খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করবে। জেলেনস্কির মতে, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের নাগরিকদের গড় আয় বা মজুরি বর্তমানে তুলনায় অন্তত তিন গুণ বৃদ্ধি করা। পুনর্গঠন কার্যক্রমকে ট্রাম্প তাঁর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন বলে জেলেনস্কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তবে এই শান্তি পরিকল্পনার পথে কিছু অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর ভাগ্য এবং দনবাস অঞ্চলে ‘অসামরিক অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (Demilitarized Economic Zone) প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এখনো মস্কোর সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা বাকি। ইউক্রেন কোনোভাবেই নিজেদের ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয়, বরং আন্তর্জাতিক তদারকিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার কথা ভাবছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে তা ইউক্রেনের জনগণের সম্মতির জন্য গণভোটে (Referendum) দেওয়া হতে পারে, তবে তার আগে অন্তত ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাম্পের এই ঝটিকা কূটনৈতিক তৎপরতা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলেও জেলেনস্কির এই ঘোষণা বিশ্ববাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্যারিসে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এই শান্তি পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপরেখা বাস্তবায়নে প্রতিটি দেশের ভূমিকা নির্ধারণ করা হবে। ইউক্রেনের জনগণের জন্য এই জানুয়ারি মাসটি হতে পারে এক নতুন ভোরের সূচনা, যেখানে বন্দুকের গর্জন ছাপিয়ে শান্তির সুবাতাস বইবে।

