বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে। লাল-সবুজ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো একটি বিশেষ ফ্রিজার ভ্যানে করে তাঁর মরদেহ বহন করা হয়। বুধবার সকাল ১১টা ৪৮ মিনিটে নিথর দেহবাহী গাড়িটি যখন সংসদ চত্বরে প্রবেশ করে, তখন সেখানে এক আবেগঘন ও শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে হিউম্যান চেইন বা মানবপ্রাচীর তৈরি করে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেশের এই শীর্ষ নেত্রীর মরদেহ অনুষ্ঠানস্থলে আনা হয়।
আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দিনের শুরু থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার শেষ যাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মরদেহ রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে বের করা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী মরদেহ তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নেওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে নেওয়া হয়, যা তাঁর ছেলে তারেক রহমানের বর্তমান আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। সেখানে বেলা ১১টা ৫ মিনিট পর্যন্ত মরহুমার আত্মীয়-স্বজন এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রিয় নেত্রীকে শেষবার দেখার জন্য সেখানে সমবেত হওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবন থেকে ১১টা ৫ মিনিটে জানাজা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে মরদেহবাহী ফ্রিজার ভ্যানটি। নিরাপত্তার খাতিরে এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে মরদেহ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিয়ে আসেন। বর্তমানে দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং বিশিষ্ট নাগরিকগণ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে সংসদ ভবনের এই প্রাঙ্গণে বহুবার পা রাখলেও, আজ তিনি ফিরলেন চিরবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আজ বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এই মহতী জানাজা পরিচালনা করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের বিশাল এলাকা জুড়ে ইতিমধ্যেই জানাজার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জানাজা শেষে তাঁকে শেরেবাংলা নগরে তাঁর স্বামী, বীরউত্তম ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। দম্পতির এই পুনর্মিলন দেশবাসীর কাছে এক বিশেষ আবেগীয় মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকেও প্রতিনিধিরা ঢাকায় পৌঁছাতে শুরু করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল জানাজায় অংশ নিতে এবং শোক জানাতে বাংলাদেশে আসছেন। এটি দেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জানাজার সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ২৭ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে রাজনৈতিক কর্মীরাও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছেন। জানাজার পর মরদেহের অন্তিম যাত্রা যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই সম্পন্ন হতে পারে, সেজন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি নেত্রী। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক বিশাল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁর প্রয়াণে বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। শোকের প্রতীক হিসেবে দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আজ বুধবার সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে আপামর জনসাধারণ তাঁদের প্রিয় নেত্রীর শেষ বিদায়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
বেগম খালেদা জিয়ার এই প্রয়াণ কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের নীরবতা। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নেতৃত্বের কথা আজ মানুষের মুখে মুখে। আজ শেষ বিদায়ের এই ক্ষণে সমগ্র জাতি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই মহীয়সী নারীকে।

