বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আজ তাঁর বিদায়লগ্নে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এক বিশেষ প্রতিবেদনে বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে এক আপসহীন এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, বেগম জিয়া তাঁর শাসনামলে প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দাতা-গ্রহীতার নীতির বদলে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করেছিলেন।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক ভারসাম্য ইন্ডিয়া টুডে জানায়, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক ভারসাম্যপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি ভারতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে চীন ও মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক গড়ার দিকে মনোযোগ দেন। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার ছিলেন। বিশেষ করে ২০০১ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি চীনকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামরিক ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০০২ সালে ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও চীনের সাথে ঐতিহাসিক ‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন তিনি, যার ফলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আধুনিক ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ ও উন্নত সামরিক সরঞ্জাম প্রাপ্তির সুযোগ পায়।
গঙ্গার পানি ও ফারাক্কা ইস্যুতে অনড় অবস্থান বাংলাদেশের প্রাণপ্রকৃতি ও কৃষি রক্ষায় গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। তিনি ঘরোয়া রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরেন। ইন্ডিয়া টুডে’র মতে, গঙ্গার পানি পেতে তিনি কেবল আলোচনার ওপর নির্ভর করেননি; বরং জাতিসংঘ এবং ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়ে বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের দাবি পেশ করেছিলেন। ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির এই কৌশলটি তাঁর কূটনীতির এক সফল দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অনুপ্রবেশ ও ট্রানজিট ইস্যুতে দৃঢ়তা ১৯৯২ সালে প্রথম ভারত সফরের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও যখন বাংলাদেশে থেকে তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশের’ অভিযোগ তোলেন, তখন বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তা নাকচ করে দেন। তিনি সরাসরি বলেছিলেন, “ভারতেও অসংখ্য বাঙালি বাস করেন এবং তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন; এর মানে এই নয় যে তাঁরা সবাই বাংলাদেশি।” তাঁর এই কূটনৈতিক দৃঢ়তা আজও বাংলাদেশে সার্বভৌমত্বের উদাহরণ হিসেবে চর্চিত হয়।
পাশাপাশি, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। বেগম জিয়া মনে করতেন, যথাযথ টোল ও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ট্রানজিট দেওয়া হবে ‘দাসত্বের সমতুল্য’। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহের জন্য করিডোর সুবিধা প্রদানে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এমন সুবিধা বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
একটি যুগের অবসান ইন্ডিয়া টুডে তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে যে, বেগম খালেদা জিয়া বিএনপিকে কেবল পুনর্গঠনই করেননি, বরং দলটিকে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ভারতের সাথে উত্তপ্ত সম্পর্কের ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আজ তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির সেই ‘স্বার্থ রক্ষাকারী’ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
উল্লেখ্য, টানা ৪০ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকার পর আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮০ বছর বয়সী এই নেত্রী। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে শোকের মাতম চলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর জাতীয়তাবাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া এসব সাহসী পদক্ষেপ আজ নতুন করে প্রশংসিত ও আলোচিত হচ্ছে।

