ইরানের টালমাটাল অর্থনীতি এবং মুদ্রার নজিরবিহীন দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ আজ তৃতীয় দিনে পদার্পণ করে এক নতুন মাত্রা ধারণ করেছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা রাজপথে নেমে এসে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরাসরি সংহতি প্রকাশ করে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে, যা তেহরানের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই তেহরানের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘গ্র্যান্ড বাজার’ ছিল সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। অর্থনৈতিক সংকটে পিষ্ট ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দোকানপাট বন্ধ রেখে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালন করেন। বিক্ষোভকারীরা সাধারণ মানুষকে দোকান বন্ধ করে আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান। তেহরানের পাশাপাশি কেরমানশাহ, ইসফাহান, শিরাজ ও মাশহাদের মতো বড় শহরগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ‘পাহলভী’ আমলের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে স্লোগান দিতে দেখা গেছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বিরল এক চিত্র।
ইরানের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতির হার ৪২.২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে অন্তত ৭২ শতাংশ। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে (১.৪২ মিলিয়নের বেশি) নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একদম শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তেহরান প্রদেশ কর্তৃপক্ষ ‘জ্বালানি ব্যবহারের স্থিতিশীলতা’র অজুহাতে পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করলেও আন্দোলনকারীরা একে বিক্ষোভ দমনের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
মোসাদের বিতর্কিত হস্তক্ষেপ ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেই গতকাল সোমবার ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন একটি ফারসি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, তারা কেবল দূর থেকে নয়, বরং সরাসরি ‘মাঠ পর্যায়ে’ বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজ (i24 News) এই খবর প্রচার করার পর তেহরান সরকার বিক্ষোভে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আরও জোরালো করেছে। যদিও স্বাধীনভাবে মোসাদের এই দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার ইরানি জনগণকে বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান ও সহিংসতা বিক্ষোভ দমাতে তেহরানসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের হটাতে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। অনেক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে এবং তেহরানের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ভয়াবহ বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি খাদের কিনারায় গিয়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট এই জনরোষ এখন শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীদের এই ধর্মঘটকে অনেকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করছেন, যা বর্তমান সরকারের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।

