মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক উগ্রবাদী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে এক বিশাল সামরিক ও নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করেছে তুরস্ক। মঙ্গলবার দেশটির অন্তত ২১টি প্রদেশে একযোগে চালানো এই অভিযানে সন্দেহভাজন ৩৫৭ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তুরস্কের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগ আজ বিকেলে এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। উত্তর-পশ্চিম তুরস্কে জঙ্গিদের সঙ্গে ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধে তিন পুলিশ সদস্য ও ছয় জঙ্গি নিহত হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় এই কঠোর পদক্ষেপ নিল আঙ্কারা।
তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলি ইয়েরলিকায়া তাঁর দাপ্তরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে অভিযানের সফলতা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তুরস্কের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে যারা এই দেশ ও জাতিকে নতজানু করতে চায়, আমরা অতীতে যেমন তাদের কোনো সুযোগ দেইনি, ভবিষ্যতেও দেব না। আমাদের মাটির প্রতিটি ইঞ্চিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
ইস্তাম্বুলের প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, কেবল ইস্তাম্বুল ও পার্শ্ববর্তী দুটি প্রদেশেই ১১৪টি সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। এসব আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক ডিজিটাল সরঞ্জাম, উগ্রবাদী লিফলেট এবং গোপন নথি জব্দ করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আসন্ন বড়দিন ও নববর্ষের উদযাপনকে কেন্দ্র করে তুরস্কের বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে বড় ধরনের নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনা করছিল এই গোষ্ঠীটি। মূলত সেই নাশকতার ছক নস্যাৎ করতেই গত এক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়, যার ধারাবাহিকতায় এর আগে আরও ১০০ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছিল।
গত সোমবার মারমারা সাগর উপকূলবর্তী ইয়ালোভা শহরের একটি বাড়িতে জঙ্গিদের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে আট ঘণ্টা ধরে অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। সেই অভিযানে পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের ব্যাপক গুলি বিনিময় ঘটে, যাতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। ঐ ঘটনার রেশ ধরেই আজ ২১টি প্রদেশে বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্টেটের তৎপরতা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় তুরস্ক সরকার চলতি বছর গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তুরস্ক দীর্ঘকাল ধরেই সিরিয়া ও ইরাক সীমান্ত দিয়ে বিদেশি যোদ্ধাদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে ইস্তাম্বুলের নাইটক্লাব ও প্রধান বিমানবন্দরে আইএসের বর্বরোচিত হামলায় শত শত মানুষের প্রাণহানি তুরস্কের জনমনে গভীর ক্ষত তৈরি করে রেখেছে।
উল্লেখ্য যে, কেবল তুরস্ক নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হয়েছে। গত সপ্তাহে নাইজেরিয়ায় এবং ১৯ ডিসেম্বর সিরিয়ায় আইএসের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও সাম্প্রতিক এক ইহুদি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলার পেছনে আইএস-অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই তুরস্কের আজকের এই বিশাল অভিযান বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুরস্কের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নববর্ষের আগে এই গণগ্রেপ্তার দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করবে এবং বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে।

