বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তি এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায়ের সংবাদে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুসংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন দলটির শীর্ষ দুই নেতা—মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিনের অভিভাবক হারানোর বেদনায় আবেগাপ্লুত এই দুই নেতার অঝোর ধারায় কান্না উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও নেতাকর্মীদের মাঝে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই শোকাতুর কণ্ঠে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জীবনের এমন এক কঠিন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সংবাদিকদের সামনে কথা বলতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করেননি। অত্যন্ত ভারী গলায় তিনি জানান, দেশবাসী এবং দলের নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন যে, প্রিয় নেত্রী বরাবরের মতোই মরণব্যাধি ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা কাটিয়ে আবারও সুস্থ হয়ে জনসম্মুখে ফিরে আসবেন।
কিন্তু আজ ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ‘গণতন্ত্রের মাতা’ ও জাতীয় অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়া না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, এই শোক ও ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হবার নয় এবং বাংলাদেশ ও এর জাতীয়তাবাদী শক্তি আজ প্রকৃত অর্থেই অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। তিনি ছিলেন এমন একজন আপসহীন নেত্রী, যিনি ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে দেশ ও জাতির কল্যাণে অটল থেকেছেন।
তাঁর এই মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা আগামী বহু বছর ধরে অনুভূত হবে। তিনি মনে করেন, কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসিক্ত নয়নে রুহুল কবির রিজভী তাঁর স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, জীবনের প্রতিটি সংকটে এবং কঠিন সময়ে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন মাথার ওপর মায়ের শীতল ছায়ার মতো। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কিংবা ব্যক্তিগত অসুস্থতা—সবকিছুর মাঝেও তাঁর অস্তিত্ব দলের নেতাকর্মীদের মনে এক অদম্য শক্তি ও সাহস জোগাত। রিজভী অত্যন্ত আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে সুদীর্ঘ কয়েক দশক তাঁর আপসহীন নেতৃত্বে ও অনুপ্রেরণায় পথ চলেছেন তাঁরা। আজ সেই বটবৃক্ষ সমতুল্য নেত্রীর প্রস্থান তাদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত হেনেছে।
রুহুল কবির রিজভী আরও উল্লেখ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া কেবল রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ধৈর্য ও ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। কারাবরণ, চরম নিপীড়ন এবং চোখের সামনে সন্তানের বিয়োগব্যথা সহ্য করেও তিনি দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে কখনো মাথানত করেননি। তাঁর এই অটুট মনোবল বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের জন্য এক বড় শিক্ষা। তিনি বলেন, সারা বিশ্বের শান্তিকামী ও মজলুম মানুষেরা আজ এই মহান নেত্রীর বিদায়ে শোক প্রকাশ করছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে দলটির এই দুই প্রবীণ নেতা বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। উপস্থিত নেতাকর্মীরাও প্রিয় নেত্রীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বিএনপি মহাসচিব দেশবাসীর কাছে বেগম জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করার বিশেষ অনুরোধ জানান এবং দলীয় শোক কর্মসূচির প্রাথমিক রূপরেখা তুলে ধরেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কালো পতাকা উত্তোলন ও নেতাকর্মীদের কালো ব্যাজ ধারণের মধ্য দিয়ে এই শোকের মাতম ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

