বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধানই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অপরাজেয় জননেত্রী। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে তাঁর প্রয়াণের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাঁর দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি নিয়ে আলোচনা করছেন— আর তা হলো তাঁর ‘অপরাজিত’ নির্বাচনী রেকর্ড। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে তিনি এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেওয়া কোনো আসনেই কখনও পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করেননি।
১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর অনেকটা নাটকীয়ভাবেই রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি রাজপথে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তবে ব্যালট যুদ্ধে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সেই থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে তিনি জনগণের বিপুল সমর্থন ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।
নির্বাচনী পরিসংংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম জিয়া প্রতিটি নির্বাচনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৫টি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বিস্ময়করভাবে, প্রতিবারই তিনি সবকটি আসনেই জয়লাভ করেন। তৎকালীন নির্বাচনি আইন অনুযায়ী এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি আসনে দাঁড়াতে পারতেন এবং তিনি সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করে নিজের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আইন পরিবর্তন করে তিনটির বেশি আসনে দাঁড়ানোর সুযোগ বন্ধ করা হলে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি ৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সেখানেও তাঁর জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অনন্য মাইলফলকগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো: ১৯৯১ সাল: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর আমলেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯৬ সাল: ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে জুন মাসের নির্বাচনে তাঁর দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও, তিনি নিজে সবকটি আসনে জয়ী হয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সাল: চারদলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০০৮ সাল: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে অপরাজিত থাকেন এবং পুনরায় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেন।
উল্লেখ্য যে, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করায় তিনি সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ছিলেন না। এ ছাড়া ২০১৮ সালে আইনি জটিলতা ও কারাবন্দি থাকার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তবে ২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তাঁর তিনটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। সমর্থকদের আশা ছিল, এবারও তিনি তাঁর জয়ের ধারা বজায় রাখবেন, কিন্তু তাঁর আগেই মৃত্যু তাঁকে ছিনিয়ে নিল।
বেগম জিয়ার এই অপরাজিত থাকার রেকর্ড কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি ছিল তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর আস্থা ও আবেগের প্রতিফলন। বগুড়া থেকে ফেনী, লক্ষ্মীপুর থেকে চট্টগ্রাম—দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তের মানুষ তাঁকে বারবার তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে কোনো নেতার এমন টানা এবং শতভাগ জয়ের রেকর্ড আর দ্বিতীয়টি নেই। তাঁর এই প্রয়াণ তাই কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচনী ঐতিহ্যের একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান।

