দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে আজ ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, যখন চারদিকে ফজরের আজান ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন নিভৃতে বিদায় নিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) আনুমানিক সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউ-তে (কোরোনারি কেয়ার ইউনিট) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর এই প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
মৃত্যুর সেই অন্তিম মুহূর্তে হাসপাতালের শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন তাঁর অতি প্রিয়জনেরা। বেগম জিয়ার বড় ছেলে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে মাত্র কয়েক দিন আগে দেশে ফিরেছেন, তিনি শেষ সময় পর্যন্ত মায়ের হাত ধরে পাশে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং নাতনি জাইমা রহমান। বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ বিচ্ছেদ শেষে জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রিয় সন্তান ও নাতনিকে পাশে পাওয়া ছিল বেগম জিয়ার জন্য এক পরম সান্ত্বনা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যু ঘোষণার সময় সেখানে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বেগম জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শার্মিলী রহমান সিঁথি। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বেগম জিয়ার ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও তাঁর স্ত্রী, এবং বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ নিকটাত্মীয়রা। রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন অশ্রুসিক্ত চোখে আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অকার্যকারিতার কারণে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ভিড় করতে শুরু করেছেন। প্রিয় নেত্রীকে হারিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, মরহুমার মরদেহ বর্তমানে হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। জানাজা ও দাফনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং সময়সূচি দলের পক্ষ থেকে আজ বিকেলের মধ্যে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। তাঁর মৃত্যুতে কেবল একটি দল নয়, বরং পুরো জাতি একজন অভিভাবকতুল্য নেত্রীকে হারাল। তাঁর জীবনভর সংগ্রাম এবং আপসহীন নেতৃত্ব বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

