আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অস্থিরতার মাঝে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিতে আবারও দূরপাল্লার কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। রোববার দেশটির শীর্ষ নেতা কিম জং উন সশরীরে উপস্থিত থেকে এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। সোমবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের এই পদক্ষেপকে কোরীয় উপদ্বীপে পারমাণবিক শক্তির অখণ্ডতা রক্ষা এবং যেকোনো সম্ভাব্য হামলার বিপরীতে পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
২০২৬ সালের শুরুতে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই রাজনৈতিক মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে কিম জং উন দেশীয় সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক বিশাল প্রদর্শনীতে মেতেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় রোববারের এই উৎক্ষেপণ কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়। কেসিএনএ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি কোরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূলীয় সাগরের ওপর দিয়ে নির্ধারিত পথ ধরে নিখুঁতভাবে উড়ে গিয়ে পূর্বপরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। উৎক্ষেপণের এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে কিম জং উন গভীর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
পরীক্ষা পরবর্তী এক বিবৃতিতে কিম জং উন বলেন, উত্তর কোরিয়া বর্তমানে বহুমুখী নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। এমতাবস্থায় দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা যাচাই করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, শত্রুপক্ষের যেকোনো উস্কানি রুখতে পিয়ংইয়ং তাদের পারমাণবিক যুদ্ধ সক্ষমতার সীমাহীন উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে। কিমের এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া তাদের সমরাস্ত্র কর্মসূচি থেকে এক চুলও নড়তে রাজি নয়।
এদিকে, উত্তর কোরিয়ার এই সামরিক তৎপরতায় প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও তাদের মিত্রদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফস (জেসিএস) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রোববার সকাল ৮টার দিকে পিয়ংইয়ংয়ের নিকটবর্তী সুনান এলাকা থেকে একাধিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সংকেত তাদের রাডারে ধরা পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন নির্মাণ এবং একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে।
উল্লেখ্য যে, গত সপ্তাহ থেকেই উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের ক্ষিপ্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি কিম জং উন তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে একটি পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেছিলেন। একই সময়ে তিনি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণও তদারকি করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ইয়োনহাপের আশঙ্কা, ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে কিম প্রশাসন আরও বড় ধরনের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে।
সিউল ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশন’-এর বিশেষজ্ঞ হং মিন মনে করেন, রোববারের এই পরীক্ষাটি সম্ভবত এমন এক উন্নত প্রযুক্তির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ছিল, যা একইসঙ্গে প্রচলিত এবং পারমাণবিক—উভয় ধরনের অস্ত্র বহনে সক্ষম। এটি দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনই নয়, কিম জং উন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি যে সচল রয়েছে, তা বোঝাতে একই দিনে একটি বড় কাগজকলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন।
কোরীয় উপদ্বীপের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রতিযোগিতা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মরিয়া প্রচেষ্টা, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির চেষ্টা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি বর্তমানে এক촉ো বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, পিয়ংইয়ংয়ের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি মূলত নতুন বছরে ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে।

