দীর্ঘ সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের প্রথম ধাপে অভাবনীয় বিজয়ের দাবি করেছে সেনাবাহিনী সমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। সোমবার দলটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, প্রথম দফার ভোটে তাঁরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও সংশয় তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে লোকদেখানো এবং সামরিক শাসনকে দীর্ঘায়িত করার একটি অপকৌশল হিসেবে অভিহিত করেছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিল মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী। এর চার বছর পর নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে কয়েক ধাপে এই নির্বাচনের আয়োজন করে জান্তা সরকার। গতকাল রবিবার দেশব্যাপী প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। যদিও মিয়ানমারের বর্তমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে খোদ দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেই প্রবল অনীহা লক্ষ্য করা গেছে।
ইউএসডিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব এলাকায় ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে নিম্নকক্ষের ১০২টি আসনের মধ্যে তারা ৮২টিতেই জয়লাভ করেছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত আসনগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই এখন জান্তাপন্থী এই দলটির কবজায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসডিপি মূলত মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর একটি বেসামরিক রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির ওই কর্মকর্তা জানান, রাজধানী নেপিদোর আটটি নির্বাচনী আসনের সবকটিতেই ইউএসডিপি জয়ী হয়েছে। তবে নির্বাচনী কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা না হওয়ায় তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০২০ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)-র কাছে এই ইউএসডিপি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। এরপরই জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং এনএলডি-কে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এবারের নির্বাচনে এনএলডির কোনো অস্তিত্ব নেই এবং অং সান সু চি বর্তমানে জান্তার কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এই একতরফা নির্বাচনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের মতে, বিরোধী মতকে দমন করে এবং প্রকৃত জনমতকে তোয়াক্কা না করে এই নির্বাচন কেবল সামরিক বাহিনীর অনুগতদের পুনর্বাসিত করার একটি মাধ্যম মাত্র।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা ফেলো মর্গান মাইকেলস এই নির্বাচনী ফলাফলকে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, জান্তা নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন বিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আগেভাগেই নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করে রেখেছে। ফলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এই নির্বাচন নিয়ে চরম অনাস্থা বিরাজ করছে। ইয়াঙ্গুনের বাসিন্দা মিন খান্ত নামক এক যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একনায়কতন্ত্রের অধীনে কোনো নির্বাচনই স্বচ্ছ হতে পারে না। সামরিক সরকারের কোনো প্রতিশ্রুতি বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। তাদের মতে, এটি কেবল জান্তার মিথ্যাচারের একটি নতুন অধ্যায়।
এদিকে, রবিবার ভোটপ্রদান শেষে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লেইং দাবি করেছেন যে, সেনাবাহিনী একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সশস্ত্র বাহিনী তাদের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। গত পাঁচ বছর ধরে দেশটি শাসন করা এই সামরিক জান্তা প্রধানের এমন দাবিকে বিশ্ব সম্প্রদায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না।
মিয়ানমারের ৩৩০টি শহরের মধ্যে ১০২টিতে প্রথম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দেশজুড়ে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে প্রায় ২০ শতাংশ আসনে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। জান্তা সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে সব এলাকায় নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগামী ১১ ও ২৫ জানুয়ারি আরও দুই ধাপে অবশিষ্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মতে, মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে এই নির্বাচন দেশটিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

