ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা ওপার বাংলার বিনোদন জগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। টেলিভিশন পর্দার অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘গোপাল ভাঁড়’ খ্যাত বিশিষ্ট অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক আর নেই। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরপারে পাড়ি জমানো এই শিল্পীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ তাঁর সহকর্মী ও অগণিত ভক্ত অনুরাগী।
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অভিনেত্রী শ্রাবণী বণিক দীর্ঘদিন ধরে মারণব্যাধি ফুসফুসের ক্যানসারে (অ্যাডিনোকার্সিনোমা) আক্রান্ত ছিলেন। এই মরণঘাতী রোগের সঙ্গে তাঁর লড়াই ছিল দীর্ঘদিনের। তবে সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তাঁকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি; আজ সন্ধ্যায় চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় তাঁর জীবনের চাকা।
গুণী এই অভিনেত্রীর চিকিৎসার পথটি ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ও ব্যয়বহুল। অসুস্থতার শেষ দিনগুলোতে তাঁর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। অসহায় এই পরিস্থিতিতে তাঁর পুত্র অচ্যুত আদর্শ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মায়ের চিকিৎসার জন্য সহৃদয় মানুষের কাছে আর্থিক সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে অনেকেই এগিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে হার মানতে হলো তাঁকে।
শ্রাবণী বণিকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র। বিশেষ করে পরিচালক স্বর্ণেন্দু সমাদ্দারের নির্দেশনায় বেশ কিছু জনপ্রিয় ধারাবাহিকে কাজ করে তিনি দর্শকের মণিকোঠায় স্থান করে নেন। ‘গোপাল ভাঁড়’ ধারাবাহিকে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি তাঁকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। এ ছাড়াও ‘রাঙাবউ’ এবং ‘মালাবদল’-এর মতো ভিন্নধর্মী নাটকে তাঁর সাবলীল ও শক্তিশালী অভিনয় আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
কেবল ছোট পর্দাতেই নয়, রূপালি পর্দাতেও শ্রাবণী বণিক তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ভারতের খ্যাতনামা অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের সঙ্গে ‘আলো’ এবং ‘চাঁদের বাড়ি’র মতো দর্শকনন্দিত ও মানসম্মত চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সাধারণ ঘরোয়া চরিত্র হোক বা জটিল মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা—সবখানেই তিনি নিজেকে মেলে ধরতেন অত্যন্ত প্রফেশনাল দক্ষতায়।
তাঁর মৃত্যুতে টলিউডের নাট্য পাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ শিল্পী তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, শ্রাবণী বণিক কেবল একজন অভিনেত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন লড়াকু মানুষ এবং সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। তাঁর প্রয়াণ বাংলা টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আজকের এই বিষণ্ন সন্ধ্যায় সহকর্মীরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছেন, পর্দার সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটি আড়ালে এত যন্ত্রণা নিয়ে লড়াই করছিল, তা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। নিজের অসুস্থতাকে ছাপিয়ে তিনি বারবার ক্যামেরার সামনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। শ্রাবণী বণিকের প্রয়াণে একটি যুগের অবসান ঘটল, তবে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন দুই বাংলার দর্শকদের হৃদয়ে।

