বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে এক শক্তিশালী অবস্থান পরিষ্কার করলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বর্তমান এনসিপির কোনো অংশ বা শরিক হচ্ছেন না। রোববার রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি ‘শীতল যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মাহফুজ আলম তার পোস্টে মূলত চারটি প্রধান দিক তুলে ধরে নিজের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং এনসিপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতাদের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল। এই সংগঠনগুলোতে তার জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধারা থাকায় গত দেড় বছর তিনি সাধ্যমতো তাদের নীতি নির্ধারণী ও পলিসিগত বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন। কিন্তু বর্তমানে দলটির গতিপথ তার লালিত স্বপ্নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি গভীর আক্ষেপের সঙ্গে জানান, একটি নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই এবং একটি মানবিক ও দায়বদ্ধ সমাজ গড়ার যে লক্ষ্য নিয়ে তিনি কথা বলেছিলেন, তা এনসিপির অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত। মাহফুজ আলমের ভাষ্যমতে, “আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম এনসিপিকে জুলাই বিপ্লবের একটি বৃহৎ ছাতা (Big July Umbrella) হিসেবে স্বতন্ত্র ও স্বকীয় উপায়ে দাঁড় করাতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নানা জটিল সমীকরণের কারণে সেটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি।”
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০ দলীয় জোট গঠন এবং সেখানে এনসিপির অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিয়ে মাহফুজ আলম তার অবস্থান আরও পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে তাকে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সেই প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “ঢাকার কোনো আসনে জোটের প্রার্থী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়ে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান (Long-standing position) ধরে রাখা আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ মূলত একটি শীতল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পর্বে কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষমতার বলয়ের পক্ষ না নিয়ে বরং নিজের নীতি ও তত্ত্বে অটল থাকাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি।” তবে তিনি বিপ্লবের তরুণ ও বিকল্প শক্তির সম্ভাবনা এখনই শেষ হয়ে গেছে বলে মানতে নারাজ। বরং তিনি মনে করেন, জুলাই শক্তির প্রকৃত উত্থান এখনও আসন্ন।
সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান অটুট রেখেও তিনি জানান, গত দেড় বছর ধরে তিনি যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে আসছেন, তা বাস্তবায়নে তিনি কাজ করে যাবেন—সেটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক যে কোনো উপায়েই হোক না কেন। পরিশেষে তিনি এক নতুন উদ্দীপনার ডাক দিয়ে বলেন, “বিকল্প ও মধ্যপন্থী তরুণ শক্তির উত্থান অত্যাসন্ন। যদি কেউ আমার এই নীতি ও দর্শনের সাথে একমত হতে চান, তবে আপনাদের জানাই সাদর আমন্ত্রণ।”
মাহফুজ আলমের এই ঘোষণা এনসিপির জন্য একটি বড় নৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা জুলাই বিপ্লবের নির্মোহ স্পিরিট ধারণ করতে চান, তাদের মধ্যে মাহফুজ আলমের এই সিদ্ধান্ত গভীর প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

