দীর্ঘ দেড় দশকের গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিরিয়ায় আবারও অস্থিরতা ও সহিংসতার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। দেশটির ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুসারী এবং শিয়া মতাবলম্বী আলাউইত সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে বর্তমান নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়াবহ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার সিরিয়ার উপকূলীয় ও মধ্যাঞ্চলীয় বিভিন্ন শহরে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ জন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কাতার-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, লাতাকিয়া, তারতুস এবং জাবলেহ-সহ সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আলাউইত সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নামলে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভকারীরা ফেডারেল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং আসাদ সরকারের সময় আটক সামরিক কর্মকর্তাদের নিঃশর্ত মুক্তি ও চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানান। এক পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গুলি বিনিময়ের ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজপথ। এতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্যসহ সাধারণ নাগরিকরা হতাহত হন।
মূলত দুই দিন আগে সিরিয়ার হোমস শহরের একটি মসজিদে বোমা হামলায় আটজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদেই এই নতুন দফার অস্থিরতা শুরু হয়। প্রবাসে বসবাসরত আলাউইত ইসলামিক কাউন্সিলের প্রধান গাজাল গাজাল এই বিক্ষোভের ডাক দেন। রোববার উপকূলীয় অঞ্চলের বিক্ষোভকারীদের হাতে গাজাল গাজালের ছবি সংবলিত ব্যানার এবং সাম্প্রদায়িক উসকানি বন্ধের দাবিতে নানা ধরনের স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। লাতাকিয়ার আজহারি গোলচত্বরে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এছাড়া তারতুসে বানিয়াসের একটি পুলিশ স্টেশনে অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা হাতবোমা নিক্ষেপ করলে দুই সেনাসদস্য গুরুতর আহত হন।
বিক্ষোভের ময়দানে থাকা ৪০ বছর বয়সী গৃহিণী হাদিল সালহা ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের প্রধান দাবি হলো অবিলম্বে দেশে ফেডারেল ব্যবস্থা চালু করা, যাতে রক্তপাত বন্ধ হয়। সিরিয়ায় আলাউইতদের রক্ত সস্তা নয়, সাধারণ মানুষের রক্তও সস্তা নয়। আমরা কেবল আমাদের সম্প্রদায়ের পরিচয়ের কারণে এভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারি না।” বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
যদিও সিরীয় সরকারি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে পরিস্থিতি বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, উপকূলীয় শহরগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি এবং থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের ঝটিকা অভিযানের মুখে টানা কয়েক দশকের আসাদ শাসনের পতন ঘটে। আসাদের পতন সিরিয়ায় দীর্ঘ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটালেও বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের কারণে দেশটিতে বারবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। বর্তমান এই অস্থিতিশীলতা সিরিয়ার ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুন করে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

