বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাল্টে গেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী মোর্চায় আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করা আলোচিত রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এর ফলে জামায়াত সমর্থিত এই জোটটি এখন ১০ দলীয় জোটে রূপান্তরিত হলো।
রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম উপস্থিত থাকলেও এনসিপির কোনো প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। তবে জামায়াত আমির স্পষ্ট করেছেন যে, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠকের মাধ্যমেই এই সমঝোতা হয়েছে এবং তারা আজ রাতেই পৃথক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা একটি মজবুত নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছেছি। এটি কেবল আসন ভাগাভাগির জোট নয়, বরং দেশ পুনর্গঠন এবং শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার একটি অঙ্গীকার। আমরা সারা দেশের ৩০০ আসনেই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করছি। যদিও এনসিপি এবং এলডিপি একেবারে শেষ মুহূর্তে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে, তবুও আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আসন সমঝোতার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি।”
আগে থেকেই এই জোটে থাকা দলগুলো হলো—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। নতুন দুই দল যুক্ত হওয়ায় জোটের শক্তিমত্তা যেমন বেড়েছে, তেমনি রাজনৈতিক মেরুকরণও স্পষ্ট হয়েছে।
জামায়াত আমির আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক রাজনৈতিক দলই এই বৃহত্তর জোটে আসতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু সময়ের স্বল্পতা এবং কারিগরি কারণে সবাইকে এই মুহূর্তে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে প্রত্যাশা নিয়ে লড়াই করেছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এই ১০ দলীয় জোটের অন্যতম দায়িত্ব।”
এদিকে, এনসিপির এই জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দলীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, জামায়াতের সাথে জোট গঠনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ৩০ জন সদস্য ইতোমধ্যে পদত্যাগ বা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তবে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে এবং আওয়ামী লীগ বা আধিপত্যবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে এই সমঝোতাকে ‘সময়োপযোগী কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং এনসিপির মতো দলগুলোর এই জোটবদ্ধ অবস্থান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এনসিপির এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই জোটের নির্বাচনী সাফল্য।

