বাংলাদেশের উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) ভাঙনের সুর আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারার পদত্যাগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সংগঠন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবীন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা থাকলেও, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তিনি নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রোববার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ ও আবেগঘন বিবৃতিতে তাজনূভা জাবীন তার এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি প্রধানত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী জোট গঠনের অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং দলের অভ্যন্তরে ‘মাইনাসের রাজনীতি’কে দায়ী করেছেন। তার মতে, যে আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শ নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বর্তমান নেতৃত্ব সেই স্পিরিট ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিবৃতিতে ডা. তাজনূভা উল্লেখ করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতার পেছনে কেবল ঐতিহাসিক বা আদর্শিক কারণ নয়, বরং যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিই তার আপত্তির মূল জায়গা। তিনি অভিযোগ করেন, এটি কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং আগে থেকেই সুনিপুণভাবে সাজানো একটি পরিকল্পনা। এনসিপি শুরুতে দেশজুড়ে ১২৫ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে মাত্র ৩০টি আসনে সমঝোতা করে বাকিদের নির্বাচনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়ের ঠিক আগমুহূর্তে এমন সিদ্ধান্তকে তিনি এক ধরনের ‘জিম্মি দশা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এনসিপির এই নেত্রী আরও দাবি করেন, দলের সাধারণ সভা বা নির্বাহী কমিটির কোনো মিটিংয়ে এমন সিদ্ধান্ত হয়নি যে জোটের স্বার্থে অন্য প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরে যেতে হবে কিংবা জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় নামতে হবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া একটি দল মাত্র ৩০টি আসনে সমঝোতা করছে, অথচ জামায়াত অন্য একটি দলের সাথে ৭০টি আসনে সমঝোতা করছে। এটি কোনোভাবেই নব্য রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিফলন হতে পারে না।”
তাজনূভা জাবীনের দীর্ঘ স্ট্যাটাসে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার চিত্রও ফুটে উঠেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, দলের শীর্ষ নেতারা নতুনের নামে পুরনো ফাঁকা বুলির রাজনীতি করছেন। এমনকি দলের ত্যাগী ও নীতিবান কর্মীদের ‘আবেগী’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, “জুলাই স্পিরিটকে এনসিপিতে চর্চা নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা সত্যিকার অর্থে নয়া বন্দোবস্তের রাজনীতি করতে চেয়েছেন, তাদের একে একে দল ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।”
নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি তার সমর্থকদের প্রতি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, নির্বাচনী কার্যক্রমের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রতিটি অর্থ তিনি পর্যায়ক্রমে ফেরত দেবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে না দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি ব্যক্তিগত প্রস্তুতির অভাব এবং বর্তমান রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের লড়াইয়ে নিজের কণ্ঠস্বর ভবিষ্যতে আরও জোরালো রাখার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ডা. তাসনিম জারা এবং ডা. তাজনূভা জাবীনের মতো প্রভাবশালী নেতাদের পদত্যাগ এনসিপির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দলের শীর্ষ পর্যায়ে এই বিভক্তি সাধারণ ভোটার ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা এই নতুন দলটি যদি শুরুতেই সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

