শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে এনসিপির একাধিক নীতিনির্ধারক নেতা নিশ্চিত করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে তারা একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। সমঝোতা অনুযায়ী, এনসিপিকে ৩৫ থেকে ৪০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। যদিও এনসিপি শুরুতে অন্তত ৫০টি আসনের দাবি জানিয়েছিল, তবে জামায়াতের সঙ্গে দরকষাকষি শেষে এই সংখ্যাটিতে রফা হয়েছে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “আশা করছি কাল বা পরশুর (রোব অথবা সোমবার) মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। এটি কোনো আদর্শিক জোট নয়, বরং নির্বাচনী কৌশল ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি আসন সমঝোতা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাজনীতিতে সব সিদ্ধান্ত সবার মনঃপূত হয় না, তবে বৃহত্তর স্বার্থে এ ধরনের পদক্ষেপ জরুরি।
জামায়াতের সঙ্গে এই আসন সমঝোতার খবর চাউর হওয়ার পর থেকেই এনসিপির অভ্যন্তরে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শনিবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরাবর একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন, যেখানে তারা এই সমঝোতার তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
স্মারকলিপিতে নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের ঐক্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং এনসিপির ঘোষিত আদর্শের পরিপন্থী। তারা জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বিভাজনমূলক রাজনীতি এবং এনসিপি কর্মীদের চরিত্র হননের অপচেষ্টার অভিযোগ তুলে একে ‘অশনি সংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন। নাহিদ ইসলাম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আগে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এখন মাত্র কয়েকটি আসনের জন্য সমঝোতা করাকে তারা ‘জাতির সঙ্গে প্রতারণা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
আসন সমঝোতার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এনসিপির অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি কোনো দলের ব্যানারে নয়, বরং ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হকও জামায়াত সংশ্লিষ্টতার প্রতিবাদে দল ছেড়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি যদি জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতায় যায়, তবে তা দলটির দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে সংকটে ফেলতে পারে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এই সমঝোতাকে ‘তারুণ্যের রাজনীতির কবর’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আগামী সোমবারের ঘোষণাটি এনসিপির জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে। একদিকে জামায়াতের সুসংগঠিত ভোটব্যাংক কাজে লাগিয়ে সংসদে যাওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে নিজেদের দলের মূল জনভিত্তি বা নতুন ধারার রাজনীতি প্রত্যাশীদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি—এই দুইয়ের দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে এনসিপি। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার হবে যে, দলটি তারুণ্যের একক শক্তিতে অটল থাকবে নাকি জোট রাজনীতির পুরনো সমীকরণে বিলীন হবে।

