শনিবার রাতভর কিয়েভ এবং এর আশপাশের এলাকায় রাশিয়ার ব্যাপক বিমান হামলায় অন্তত একজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং দুই ডজনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো কিয়েভ শহর। কয়েক ঘণ্টা ধরে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বাজার পর উজ্জ্বল আলোর ঝলকানির সাথে কিয়েভের আকাশে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে।
কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর মিকোলা কালাশনিক নিশ্চিত করেছেন যে, এই হামলায় ৪৭ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন। রাজধানীর মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, আহত ১৯ জনের মধ্যে ১১ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাশিয়ার এই পরিকল্পিত হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো। ফলে প্রচণ্ড হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক বর্তমানে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এছাড়া প্রায় ২ হাজার ৬০০টি আবাসিক ভবন এবং কয়েক শ কিন্ডারগার্টেন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা (হিটিং সিস্টেম) অচল হয়ে পড়েছে। এই মানবিক সংকটকে পুঁজি করে রাশিয়া বিশ্ববাসীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে বলে অভিযোগ তুলেছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, “রুশরা চায় ইউক্রেনের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াতে। তারা শান্তির পরিবর্তে সংঘাত দীর্ঘায়িত করার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।”
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের প্রায় তিন বছর হতে চলল। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু আর অগণিত সম্পদের ধ্বংসলীলা থামানোর লক্ষ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই পরিকল্পনার বিস্তারিত নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যেই জেলেনস্কি রোববার ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মুখোমুখি হবেন। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় ২০ দফার একটি রূপরেখা রয়েছে, যেখানে বর্তমান যুদ্ধরেখা বরাবর সংঘাত স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া একটি বাফার জোন বা অসামরিক এলাকা গড়ে তোলার বিনিময়ে পূর্বাঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও আলোচনায় থাকতে পারে।
তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নিয়ে নেতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার মস্কোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, জেলেনস্কি এবং তার ইউরোপীয় সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছেন। জেলেনস্কি অবশ্য বারবারই দাবি করে আসছেন, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেই কেবল স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জেলেনস্কির এই যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বৈঠকটি ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যখন রাশিয়ার আগ্রাসন আরও তীব্র হচ্ছে এবং ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ ও তাপের অভাবে ধুঁকছে, তখন ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান কিয়েভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্কোর বর্তমান রণকৌশল মূলত ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং পশ্চিমা জোটের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। তবে জেলেনস্কি দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন, রাশিয়ার প্রতিটি আঘাত ইউক্রেনের প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করছে।
আগামীকালের ফ্লোরিডা বৈঠকের ওপর এখন সারা বিশ্বের নজর। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা এবং শান্তি প্রস্তাবের ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জেলেনস্কি চাইছেন যুদ্ধের অবসান, কিন্তু সেটি হতে হবে সম্মানজনক এবং স্থায়ী। রাশিয়ার ক্রমাগত হামলা সত্ত্বেও কিয়েভ যে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে না, এই সফরের মাধ্যমে জেলেনস্কি সেই বার্তাই বিশ্বনেতাদের দিতে চাইছেন।

