শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমা। শুক্রবার বিকেলে শাহবাগ মোড়ে এক বিশাল ছাত্র-জনতার সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি সরকারের গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জুমা বলেন, “যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার গুরুভার নাগরিক সংগঠনগুলোকেই বহন করতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের করের টাকায় এই সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা কোথায়?”
আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ মোড়ে এসে পৌঁছালে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও সমর্থক সেখানে অবস্থান নেন।
এসময় শাহবাগ চত্বর অবরোধ করায় রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই মোড়ে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশ থেকে “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার”, “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”, “এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ্য হাদি লড়াই করে” এবং “লীগ ধর, জেলে ভর” এমন সব জোরালো স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
বক্তব্যের শুরুতেই শহীদ হাদির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফাতিমা তাসনিম জুমা। তিনি বলেন, “যে ভাইয়ের বজ্রকণ্ঠে আমরা রাজপথে স্লোগান শুনতাম, আজ তাকে কবরে রেখে আমাদের এখানে বিচার চাইতে হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য কেবল শোক নয়, বরং এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
তিনি হাদির আদর্শের কথা উল্লেখ করে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে তথাকথিত নেতার অভাব নেই, কিন্তু ওসমান হাদি নিজেকে সবসময় একজন ‘কর্মী’ হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। তাঁর এই নির্লোভ ও ত্যাগী মানসিকতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত নেতায় পরিণত করেছে। মৃত্যুর পরেও তিনি আমাদের লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা ও স্লোগান হয়ে বেঁচে আছেন।
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশাসনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জুমা বলেন, হাদির মৃত্যুর পর খুনিরা কোথায় আছে বা কীভাবে দেশ ত্যাগ করছে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। উল্টো ইনকিলাব মঞ্চকেই খুনিদের অবস্থান শনাক্ত করতে হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গোয়েন্দা সংস্থার কাজও যদি আমাদের করতে হয়, তবে এমন অকার্যকর সরকারকে কেন জনগণ সমর্থন দেবে?”
এছাড়া এই আন্দোলনকে একটি মহল ‘মব জাস্টিস’ বা বিশৃঙ্খলা হিসেবে চিহ্নিত করার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইনকিলাব মঞ্চ কখনো সহিংসতায় বিশ্বাস করে না এবং তাদের কোনো কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলার রেকর্ড নেই। বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করা এবং নির্বাচন পেছানোর অজুহাত হিসেবে বিচার আটকে রাখার এই কৌশল জনগণ সফল হতে দেবে না।
ইনকিলাব মঞ্চের এই মুখপাত্র আরও ঘোষণা করেন যে, খুনি যত প্রভাবশালী বা শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আসতেই হবে। তিনি উপস্থিত সমর্থকদের নির্দেশ দেন যেন কোনো অনুপ্রবেশকারী আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে।
কেউ এমন চেষ্টা করলে তাকে ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “শাহবাগ সাক্ষী থাকুক, যতক্ষণ পর্যন্ত শহীদ হাদি ভাইয়ের রক্তের ইনসাফ কায়েম না হবে, ততক্ষণ আমরা রাজপথ ছাড়ব না। এই বাংলার জমিনেই খুনিদের বিচার হবে এবং সেই বিচার আমরা এই শাহবাগ থেকেই আদায় করে ছাড়ব।”
সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের এই অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে তাঁরা শাহবাগে রাত্রিযাপন এবং আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করতেও প্রস্তুত রয়েছেন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারীদের অবস্থান ও স্লোগানে এক টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

