ইতালির সিসিলি দ্বীপের ভিটোরিয়া শহরে উন্নত জীবনের আশায় আসা দুই বাংলাদেশি যুবক স্বদেশী পাচারকারী চক্রের হাতে নৃশংস অপহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই লোমহর্ষক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চার বাংলাদেশি নাগরিককে শনাক্ত করেছে স্থানীয় পুলিশ।
এদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একজন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। কাতানিয়া পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের নির্দেশে রাগুসা পুলিশ সদর দপ্তর ২৫ থেকে ৪৩ বছর বয়সী এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক রাখার আদেশ কার্যকর করেছে।
তদন্তকারীদের তথ্যমতে, এই অপরাধের ধরনটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের নিষ্ঠুর পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রসিকিউটর কার্যালয়ের অ্যান্টি-মাফিয়া অধিদপ্তর (ডিডিএ) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভিটোরিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই ঘটনাটি ঘটে।
অভিযুক্তরা ইতালির বৈধ কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’-র সুযোগ নিয়ে নিয়মিত পথে আসা দুই যুবককে চাকরি ও আইনি চুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে সিসিলিতে ডেকে আনে। কিন্তু তারা সেখানে পৌঁছানোর পরপরই এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগীদের একটি নির্জন গ্রামীণ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়, যা আদতে ছিল একটি অন্ধকার কারাগার। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর পরই তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং হাত-পা বেঁধে আলাদা কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। অভিযুক্তরা লোহার রড, ধাতব পাইপ এবং শিকল দিয়ে তাঁদের নির্মমভাবে মারধর করে। এমনকি তাঁদের শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে চলা এই পৈশাচিক নির্যাতনে ভুক্তভোগীরা মারাত্মকভাবে আহত হন।
অপরাধীদের কৌশলটি ছিল আরও বেশি নৃশংস। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, নির্যাতনের সময় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের ফোন করে চিৎকার শোনানো হতো, যাতে তারা আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত অর্থ পাঠাতে বাধ্য হয়। পাচারকারীরা নিজেদের সংগঠিত অপরাধ চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে পরিবারের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৭ লক্ষ টাকা) মুক্তিপণ দেওয়ার পর ওই দুই যুবককে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে মুক্তির সময় পুলিশকে জানালে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
রাগুসা ফ্লাইং স্কোয়াডের বিদেশি অপরাধ শাখা জানিয়েছে, এই অপরাধের ধরনটি মূলত লিবিয়ার অভিবাসী পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোর ব্যবহৃত কৌশলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। লিবিয়ায় যেভাবে অভিবাসীদের জিম্মি করে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা হয়, ঠিক একই কায়দায় ইতালির মাটির ভেতরে এই পৈশাচিকতা চালানো হয়েছে। ইতালীয় বিচার বিভাগ একে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে এবং ডিডিএ-র তত্ত্বাবধানে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলমান রয়েছে।
কাতানিয়ার তদন্ত বিচারকের জারিকৃত আদেশ অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত তিন অভিযুক্তকে বর্তমানে কারাগারে রাখা হয়েছে এবং চতুর্থ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় রাখা হবে। এই ঘটনা ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

