ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদির রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি ভারতকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ। বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখ সংগঠন ‘শিখ ফর জাস্টিস’ (এসএফজে)-এর ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশগুলো থেকে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে একযোগে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, কানাডার টরন্টো ও ভ্যানকুভার, ইতালির মিলান এবং অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হন।
তাদের হাতে থাকা ব্যানার ও ফেস্টুনে ওসমান হাদি এবং শিখ নেতা হারদীপ সিং নিজ্জারের ছবি প্রদর্শন করে ভারতের ‘গুপ্তহত্যা’ নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ওসমান হাদি ও হারদীপ সিং নিজ্জার—উভয়েই ভারতীয় আধিপত্যবাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন এবং সে কারণেই তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কানাডা, যেখানে ২০২৩ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারে শহরে একটি গুরুদ্বারের সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন হারদীপ সিং নিজ্জার। সেই হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন স্বয়ং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, যা নিয়ে দিল্লি ও অটোয়ার মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। এখন ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সাথেও একই ধরনের যোগসূত্র পাওয়ার দাবি করে শিখ নেতারা বলছেন, ভারত সরকার দেশের ভেতরে এবং বাইরে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে এক ভয়াবহ ‘ঘাতক স্কোয়াড’ ব্যবহার করছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক সাহসী কণ্ঠস্বর এবং ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছিলেন। তার এই জাতীয়তাবাদী অবস্থান ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে শিখ ফর জাস্টিসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তারা মনে করেন, হাদিকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ভারত আসলে আঞ্চলিক মুক্তিকামী শক্তিগুলোর কাছে একটি ভীতিকর বার্তা পাঠাতে চেয়েছে। বুধবারের এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল শিখ নেতাদের ওপর ভারত সরকারের ধারাবাহিক দমন-পীড়ন এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা।
উল্লেখ্য, ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য কেন্দ্রিক শিখরা দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের জন্য ‘খলিস্তান’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে প্রবাসী শিখদের একটি বড় অংশ এই দাবির সপক্ষে বিশ্বজুড়ে লবিং ও জনমত গঠন করে থাকে। ভারত সরকার এসব তৎপরতাকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে অভিহিত করলেও শিখ নেতারা একে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের লড়াই হিসেবে দেখেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবাসী শিখ নেতাদের ওপর একের পর এক হামলা ও হত্যার ঘটনা এই বিরোধকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে।
ওসমান হাদিকে ঘিরে শিখদের এই বৈশ্বিক সংহতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একজন বাংলাদেশি এক্টিভিস্টের জন্য শিখ সম্প্রদায়ের এই বিশাল বিক্ষোভ ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবেন।

