যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে এবার বড়দিন এসেছে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। একদিকে যখন উৎসবের আলোয় সেজেছে বিশ্ব, অন্যদিকে তখন রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রকম্পিত ইউক্রেনের মাটি। এমন এক প্রতিকূল সময়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বড়দিনের বার্তায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। অত্যন্ত আবেগঘন ও কঠোর ভাষায় দেওয়া এই ভাষণে জেলেনস্কি সরাসরি পুতিনের নাম উচ্চারণ না করলেও তার ‘ধ্বংস’ বা ‘পতন’ কামনা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বড়দিনের এই বিশেষ বার্তায় জেলেনস্কি তার দেশের মানুষের মনোবল বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ধ্বংসলীলা চালিয়ে এবং অবকাঠামো দখল করে সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ বয়ে আনলেও, তারা ইউক্রেনীয়দের আত্মিক শক্তিকে স্পর্শ করতে পারেনি। জেলেনস্কি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “রাশিয়া আমাদের ওপর সীমাহীন কষ্ট চাপিয়ে দিলেও তারা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলো ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের মন, একে অপরের প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং জাতীয় ঐক্য— যা কোনো বোমাবর্ষণ বা দখলদারিত্ব দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।”
ভাষণের এক পর্যায়ে জেলেনস্কি তার এবং সমগ্র ইউক্রেনীয় জাতির পক্ষ থেকে একটি সাধারণ স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন। রুশ প্রেসিডেন্টের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আজ আমাদের সবার মনে একটিই প্রার্থনা এবং একটিই অভিন্ন প্রত্যাশা— আর তা হলো তার চূড়ান্ত বিনাশ।” যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে জেলেনস্কির এই মন্তব্যকে তার সর্বোচ্চ স্তরের ক্ষোভ এবং প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় অন্তত তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের বিশাল একটি অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। বড়দিনের প্রাক্কালে এমন অমানবিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট বলেন, “ক্রিসমাসের আগের সন্ধ্যায় রাশিয়া আবারও বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের প্রকৃত পরিচয় কী। শত শত ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং কিনঝাল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা যেভাবে বেসামরিক মানুষের ওপর আঘাত হেনেছে, তা কেবল ধর্মহীন ও নীতিবিবর্জিত শক্তির পক্ষেই সম্ভব।”
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পুতিনের নির্দেশে শুরু হওয়া এই পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের প্রায় তিন বছর হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তবুও পিছু না হটে পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তায় প্রতিরোধ জারি রেখেছে কিয়েভ। জেলেনস্কির বড়দিনের এই বার্তা কেবল একটি ধর্মীয় শুভেচ্ছা নয়, বরং এটি রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের আপসহীন মানসিকতার এক দলিল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে জেলেনস্কির বক্তব্য ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ এবং সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের নতুন করে প্রেরণা জোগাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, জেলেনস্কির এই বক্তব্য ক্রেমলিনের সাথে ইউক্রেনের বিদ্যমান সংঘাতের পারদকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যেখানে বড়দিনের সময় সাধারণত যুদ্ধবিরতি বা শান্তি কামনার প্রথা থাকে, সেখানে জেলেনস্কির এই কঠোর অবস্থান যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাসের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে।

