দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রেখেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বীরের বেশে স্বদেশে ফেরার পর আজ বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) সুবিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম ভাষণ প্রদান করেন।
লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর হর্ষধ্বনি আর গগনবিদারী স্লোগানের মাঝেও তারেক রহমানের কণ্ঠে ফুটে ওঠে এক সন্তানের আকুলতা। অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এখন আমি আপনাদের সামনে এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু সন্তান হিসেবে আমার মন পড়ে আছে হাসপাতালের সেই ঘরে, আমার মায়ের বিছানার পাশে।”
বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে যখন তিনি মঞ্চে আরোহণ করেন, তখন পুরো এলাকা এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে রূপ নেয়। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি তাঁর মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
তারেক রহমান বলেন, “দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এই দেশের মাটি ও মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন। তাঁর সাথে বিগত বছরগুলোতে কী হয়েছে, তা আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ অবগত আছেন। সন্তান হিসেবে আজ আপনাদের কাছে আমার একটাই চাওয়া—আপনারা আল্লাহর দরবারে দোয়া করবেন যেন আল্লাহ উনাকে সুস্থতা দান করেন এবং উনি দ্রুত আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পারেন।”
দীর্ঘ ১ যুগ ৮ মাস পর দেশের মাটিতে ফিরলেও তারেক রহমান ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে জনস্বার্থ এবং জাতীয় শৃঙ্খলাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি উপস্থিত লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ আপনাদের মাঝে আসতে পেরেছি।
আপনাদের প্রতি এই কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্যই আজ আমি সরাসরি হাসপাতালে না গিয়ে এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছি। তবে আমার অন্তর সারাক্ষণ মায়ের অসুস্থতার চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে আছে।” তাঁর এই বক্তব্য উপস্থিত জনতার মাঝে এক পিনপতন নীরবতা ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আমরা যে ধর্মেরই হই, যে রাজনৈতিক দলেরই সদস্য হই অথবা নির্দলীয় ব্যক্তি হই না কেন—যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হবে।
কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি রাষ্ট্র নিশ্চিত করা যেখানে শিশু, নারী বা পুরুষ—যেকোনো বয়স বা পেশার মানুষ নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারে। এটিই হোক আজকের দিনের আমাদের প্রধান প্রতিজ্ঞা।”
উল্লেখ্য যে, আজ বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমান সপরিবারে ঢাকায় অবতরণ করেন। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর থেকে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত পুরো পথেই ছিল মানুষের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ করেই তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে রওনা হন। দীর্ঘ বছর পর মা ও ছেলের এই পুনর্মিলনকে কেন্দ্র করে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, বরং সারা দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক কৌতূহল ও আবেগ কাজ করছে।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর প্রথম বক্তৃতায় শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতি যে কঠোর বার্তা প্রদান করা হয়েছে, তা দেশের রাজনীতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যক্তিগত বেদনা ও সন্তানের আকুলতা বুকে চেপে তিনি যেভাবে দেশের শান্তিকামী মানুষের কথা বলেছেন, তা উপস্থিত লাখো মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। আজকের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারেক রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই নন, বরং একজন আদর্শ সন্তান হিসেবেও জনগণের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।

