দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক ও রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নিজ জন্মভূমিতে পা রাখলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) সুবিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারণী ভাষণ প্রদান করেন।
লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর হর্ষধ্বনি আর গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বিশ্বখ্যাত বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিং-এর অমর বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর আগামীর রাজনৈতিক দর্শনের মূলমন্ত্র ঘোষণা করেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, “মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন—আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম; আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি আপনাদের সামনে বলতে চাই—আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান।”
বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে যখন তারেক রহমান সংবর্ধনা মঞ্চে আরোহণ করেন, তখন পুরো এলাকা এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে রূপ নেয়। দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর প্রিয় নেতাকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত জনতা। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে এবং আপনাদের দোয়ায় আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি।” তিনি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানকে একসূত্রে গেঁথে উল্লেখ করেন যে, এ দেশের মানুষ বারবার নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে।
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক এবং নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যা একজন মা দেখেন। অর্থাৎ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমাদের লক্ষ্য; যেখানে একজন নারী, পুরুষ বা শিশু—যিনিই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।”
তিনি পাহাড় ও সমতলের মানুষের বৈচিত্র্য এবং হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষ এখন কেবল কথা বলার অধিকারই নয়, বরং যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের প্রতিটি ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে চায়।
বক্তব্যের মূল আকর্ষণ ছিল তাঁর ঘোষিত ‘প্ল্যান’ বা পরিকল্পনা। তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, উন্নয়নের জন্য এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তনের জন্য। তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়ে বলেন, “যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে এই জনসমুদ্রে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের এবং সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি নাগরিকের সহযোগিতা আমার লাগবে।
আপনারা পাশে থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা এই ‘প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, তারা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে তারেক রহমান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সদস্য ওসমান হাদির কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ওসমান হাদির মতো অসংখ্য বীর তরুণ চেয়েছিল এ দেশে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।
শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তিনি তরুণ প্রজন্মকে আগামীর নেতৃত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “তোমরাই আগামী দিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে। তোমাদের দায়িত্ব নিতে হবে যাতে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর আমরা রাষ্ট্রকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি।”
বক্তব্যের একটি বড় অংশে তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে সজাগ থাকার এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন আধিপত্যবাদী শক্তির গুপ্তচরেরা বর্তমানে নানাভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, তাই যেকোনো উসকানির মুখে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। আমরা দেশে শান্তি চাই।” তিনি দেশবাসীকে নিশ্চিত করতে বলেন যে, কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো ধর্মের বা রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে।
ব্যক্তিগত ও আবেগীয় প্রসঙ্গে তারেক রহমান তাঁর মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে। কিন্তু আপনারা যারা তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।” তিনি দেশবাসীর কাছে তাঁর মায়ের সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, খালেদা জিয়া এ দেশের মাটি ও মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। দীর্ঘ দেড় যুগের বিচ্ছেদ শেষে মা-ছেলের এই পুনর্মিলনকে ঘিরে সারা দেশে এক অভূতপূর্ব আবেগপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। হাসপাতাল থেকে তিনি গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে। আজকের এই ঐতিহাসিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারেক রহমান কেবল দেশেই ফিরলেন না, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন উন্নয়নমুখী, পরিকল্পিত এবং সুশৃঙ্খল ধারার সূচনা করলেন।

