দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়কের বিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি শহীদ ওসমান হাদিসহ সকল বিপ্লবীর স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “চব্বিশের আন্দোলনের সাহসী প্রজন্মের সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে; তিনি শহীদ হয়েছেন। ওসমান হাদি চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত সকল শহীদের ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তিনি বলেন, “শহীদদের রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, তবে আসুন আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্পর্শকাতরতা উল্লেখ করে তারেক রহমান ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “বিভিন্ন আধিপত্যবাদী শক্তির গুপ্তচরেরা বর্তমানে নানাভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আমাদের যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে এবং যেকোনো উসকানির মুখে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করতে হবে।” তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ কেবল দেশের শত্রুদেরই সুবিধা দেবে, তাই প্রতিটি নেতাকর্মীকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পথ চলতে হবে।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল তরুণ প্রজন্মের প্রতি দিকনির্দেশনা। তারেক রহমান তরুণদের আগামীর নেতৃত্বের মূল কারিগর হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “তোমরাই আগামী দিনে এই দেশকে নেতৃত্ব দেবে এবং দেশ পুনর্গঠন করবে। আজ সেই দায়িত্ব গ্রহণের সময় এসেছে, যাতে আমরা একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর বাংলাদেশকে দাঁড় করাতে পারি।” তিনি বিশ্বাস করেন যে, তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি ও দেশপ্রেমই পারে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র উপহার দিতে।
উল্লেখ্য যে, বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে যখন তারেক রহমান সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছান, তখন সেখানে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট পর্যন্ত দীর্ঘ পথজুড়ে অপেক্ষমাণ লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি মঞ্চে আরোহণ করেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেন। শহীদ ওসমান হাদির মতো অসংখ্য বিপ্লবীর রক্তে ভেজা এই মাটিকে শান্ত ও নিরাপদ রাখার যে ঘোষণা তিনি আজ দিয়েছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে যান। মা ও ছেলের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পুনর্মিলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আবেগপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। হাসপাতাল থেকে তিনি গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে। আজকের এই সংবর্ধনা সভার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান কেবল দেশেই ফিরলেন না, বরং শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক নতুন সংগ্রামের সূচনা করলেন।

