দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার বীরের বেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজকীয় এই প্রত্যাবর্তনের দিনে রাজধানীর পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) সুবিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন।
লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর হর্ষধ্বনি আর গগনবিদারী স্লোগানের মধ্য দিয়ে দেওয়া এই বক্তৃতায় তারেক রহমান তাঁর আগামীর রাজনৈতিক দর্শনের মূলমন্ত্র তুলে ধরেন। বিশ্বখ্যাত বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিং-এর অমর বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, “মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন—আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম; আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি বলছি—আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান।”
বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে যখন তারেক রহমান সংবর্ধনা মঞ্চে আরোহণ করেন, তখন পুরো ৩০০ ফিট এলাকা এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মঞ্চে উঠে তিনি প্রথমে হাত নেড়ে উপস্থিত জনতা ও নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। এ সময় মঞ্চে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর প্রধানরাও উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি মহান আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে এবং আপনাদের দোয়ায় আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি।”
তারেক রহমান তাঁর ভাষণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা একজন মা দেখেন। অর্থাৎ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমাদের লক্ষ্য; যেখানে একজন নারী, পুরুষ বা শিশু—যিনিই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।” তিনি পাহাড় ও সমতলের মানুষের বৈচিত্র্য এবং হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, এ দেশের মানুষ স্বৈরাচারের হাত থেকে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে জানে।
বক্তব্যের মূল অংশে তারেক রহমান তাঁর ‘প্ল্যান’ বা পরিকল্পনা নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর এই পরিকল্পনা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি দেশের উন্নয়ন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন এবং একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি রচনার ব্লুপ্রিন্ট। মার্টিন লুথার কিং-এর স্বপ্নকে কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তরের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে। আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন, তবে ইনশাআল্লাহ আমরা একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হব।” তিনি আরও যোগ করেন, “উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।”
ভাষণের শেষের দিকে তারেক রহমান উপস্থিত নেতাকর্মীদের যেকোনো উসকানির মুখে ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ দেন। তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বিভিন্ন আধিপত্যবাদী শক্তির গুপ্তচরেরা বর্তমানে নানাভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আমাদের যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।” তিনি বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মকে আগামীর নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার ডাক দেন এবং গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ‘ইচ্ছা করলে আপনি সম্মানিত করেন’—এবং বর্তমান রাজনৈতিক বিজয়কে আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে অভিহিত করেন।
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে যান। দীর্ঘ দেড় যুগের বিচ্ছেদ শেষে মা-ছেলের এই পুনর্মিলনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক আবেগ কাজ করছে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে তাঁর পরিবার আগে থেকেই অবস্থান করছে। আজকের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারেক রহমান কেবল দেশেই ফিরলেন না, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন উন্নয়নমুখী ও পরিকল্পিত ধারার সূচনা করলেন।

