দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাজধানী ঢাকার গুলশানে নিজ বাসভবনে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে তারা গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে প্রবেশ করেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তারা সরাসরি এই বাসভবনে পৌঁছান। জুবাইদা ও জাইমা রহমানের এই ফেরা ঘিরে গুলশান এলাকায় এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
তারেক রহমানকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণ করার পর বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। তারেক রহমান বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত বিশাল গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও তার স্ত্রী ও কন্যা সরাসরি গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দুপুর ১টার দিকে তাদের বহনকারী গাড়িটি গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়ির গেটে পৌঁছালে সেখানে অপেক্ষমাণ কয়েক হাজার নেতাকর্মী উল্লাসে ফেটে পড়েন। এ সময় ব্যারিস্টার জাইমা রহমান গাড়ির ভেতর থেকে হাত নেড়ে উপস্থিত জনতাকে শুভেচ্ছা জানান এবং তাদের ভালোবাসার জবাব দেন।
তারেক রহমানের পরিবারের সদস্যদের এই আগমনে গুলশান এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়েছে। ১৯৬ নম্বর বাসভবনটি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’র ঠিক পাশেই অবস্থিত।
বাড়িটির আশেপাশে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে গুলশান-২ এর পার্শ্ববর্তী সড়কগুলোতে সাধারণ যান চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ট্রাফিক পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) সদস্যরাও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছেন।
এর আগে বিমানবন্দরে তারেক রহমান ও তার পরিবারকে বরণ করে নেওয়ার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষে ভিআইপি লাউঞ্জে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।
সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশে তারেক রহমানের শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু তার মেয়ে, জামাতা ও নাতনিকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। দীর্ঘ দেড় যুগের বিচ্ছেদ শেষে পরিবারের সদস্যদের এই মিলন মেলা উপস্থিত সবার চোখে পানি এনে দেয়।
তারেক রহমানের পরিবারের সদস্যদের এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিশেষ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০০৮ সালে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে লন্ডনে যাওয়ার পর থেকে তারা সেখানেই অবস্থান করছিলেন।
আজ তাদের এই ফিরে আসা কেবল একটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়, বরং দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে এক বিশাল বিজয়ের প্রতীক। গুলশানের এই বাড়িটি এখন নেতাকর্মীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতাকর্মীরা তাদের প্রিয় নেত্রীর পুত্রবধূ ও নাতনিকে একনজর দেখতে ভিড় করছেন।
অন্যদিকে, তারেক রহমান বর্তমানে ৩০০ ফিট এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত সংবর্ধনা মঞ্চে অবস্থান করছেন। সেখানে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান শেষে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন। হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি সরাসরি গুলশানের এই ১৯৬ নম্বর বাড়িতেই উঠবেন, যেখানে আগে থেকেই তার স্ত্রী ও কন্যা অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ সময় পর পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে এই বাড়িতে রাত কাটাবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও জুবাইদা ও জাইমা রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রচার করছে। বিশেষ করে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। আজকের এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তা আরও দৃশ্যমান হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। গুলশান এলাকার প্রতিটি তোরণ এবং ব্যানার এখন তাদের স্বাগত জানিয়ে সাজানো হয়েছে, যা এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

