দীর্ঘ ১৭ বছর বা ৬ হাজার ৩১৪ দিনের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজ জন্মভূমিতে ফিরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটটি (বিজি-২০২ বোয়িং ৭৮৭-৯০০ ড্রিমলাইনার) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা জুড়ে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিমানবন্দরের সিআইপি গেটে অবতরণের পর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশ করেন তারেক রহমান। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যরা। দীর্ঘ দেড় যুগের বিচ্ছেদ শেষে প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দলীয় শীর্ষ নেতারা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পর তারেক রহমান একে একে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলিঙ্গন ও কুশল বিনিময় করেন। এরপর সেখানে এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয় যখন তার শাশুড়ি তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
এর আগে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৬ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। দীর্ঘ যাত্রা শেষে আজ সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমানটি প্রথমে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেলা ১১টা ১২ মিনিটে বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে চূড়ান্ত যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশের সাথে সাথেই তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক লাইনের একটি আবেগঘন বার্তায় লিখেন, “দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!” মুহূর্তেই তার এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানকে বহন করার জন্য বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লাল-সবুজ রঙে সজ্জিত একটি বিশেষ বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করেন। বাসটির গায়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত প্রতিকৃতি এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি শোভা পাচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট সড়কের (৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে) দিকে রওনা হওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে অপেক্ষমাণ লক্ষাধিক নেতাকর্মীর স্লোগান ও ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখানে উপস্থিত লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
এরপর তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার মা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ বছর পর মা ও ছেলের এই পুনর্মিলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল বিরাজ করছে। হাসপাতাল থেকে তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র পাশের নিজস্ব বাসভবনে যাবেন।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজধানী জুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট এবং গুলশান এলাকা পর্যন্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে।
বিএনপি নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার পর আজ তার ফিরে আসা দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য এক বিশাল বিজয়। এই ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিবাচক ধারার সূচনা হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

