দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর থেকেই রাজধানী ঢাকা এক অভূতপূর্ব উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে সংবর্ধনাস্থল হিসেবে নির্ধারিত রাজধানীর পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকা এখন লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে এক বিশাল জনসমুদ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। সকাল থেকেই ব্যানার, ফেস্টুন আর দলীয় পতাকায় ছেয়ে যাওয়া এই এলাকায় মুহুর্মুহু স্লোগানে এক অনন্য আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটটি যখন ঢাকার আকাশে দেখা দেয়, তখন থেকেই সংবর্ধনাস্থলে অপেক্ষমাণ জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তিনি যখন একটি বিশেষ বাসে চড়ে ৩০০ ফিট সংবর্ধনাস্থলের দিকে রওনা হন, তখন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষ তাকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান।
এ সময় নেতাকর্মীদের কণ্ঠে ‘তারেক রহমান বীরের বেশে, ফিরে এলেন বাংলাদেশে’ এবং ‘তারেক রহমান আসছে, বাংলাদেশ হাসছে’—এমন সব আবেগী স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর তাদের প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে ৩০০ ফিট সড়ক ও এর আশপাশের এলাকাগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
সংবর্ধনাস্থলের মূল মঞ্চে এরই মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা আসন গ্রহণ করেছেন। মঞ্চের সামনে এবং আশপাশে লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি কয়েক হাজার দলীয় স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। তীব্র শীত উপেক্ষা করে রাত থেকেই অনেক নেতাকর্মী সংবর্ধনাস্থলের আশেপাশে অবস্থান নিয়েছেন।
তাদের চোখে-মুখে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের আনন্দ। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা এক বৃদ্ধ সমর্থক জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছেন তিনি; আজ তার নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তার কাছে ঈদের আনন্দের চেয়েও বড়। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৃণমূল পর্যায়ে কতটা সুদৃঢ়।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুরো এলাকা জুড়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। সংবর্ধনাস্থলে আগত নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলার সাথে অবস্থান করার জন্য বারবার মাইকিং করা হচ্ছে। ড্রোন এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনদুর্ভোগ এড়াতে এবং সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সংবর্ধনাস্থলের আশেপাশে পর্যাপ্ত সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার পর এটিই তার প্রথম দেশে ফেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই উপস্থিতিতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হবে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার এই ফিরে আসা দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করেছে, যা ৩০০ ফিট এলাকার বর্তমান জনস্রোত দেখলেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
বিকেল নাগাদ তারেক রহমান সংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছানোর পর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন বলে কথা রয়েছে। এই ভাষণে তিনি দেশের বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাবেন। দীর্ঘ বছর পর মা ও ছেলের এই পুনর্মিলন নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের আবেগীয় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

