দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের ইতি ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।
জনপ্রিয় এই রাজনৈতিক নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে গুলশানের বাসভবন পর্যন্ত প্রতিটি মোড় ও কৌশলগত পয়েন্টে কয়েক হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।
এবারের নিরাপত্তা পরিকল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদরদপ্তর থেকে সরাসরি এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পুরো কার্যক্রম তদারকি করা হবে। মাঠ পর্যায়ে ডিএমপির উত্তরা ও গুলশান বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করলেও কোনো একক ডিভিশনের ওপর দায়িত্ব না রেখে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
পুলিশের পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ) এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তার মূল স্তরে নিয়োজিত থাকবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে তারেক রহমানের নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে এই বিশেষ নিরাপত্তা ‘প্রটোকল’ সাজানো হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে গুলশান: দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা রুট গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে ৩-০০ ফিট হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং গুলশান অ্যাভিনিউর বাসভবন পর্যন্ত পুরো পথটি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশি চেকপোস্টের পাশাপাশি মোতায়েন থাকবে পুলিশের ‘স্পেশাল স্কট’।
বর্তমানে গুলশান ও বারিধারা এলাকায় বিদ্যমান চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়িয়ে আরও নিশ্ছিদ্র করা হচ্ছে। তারেক রহমানের বাসভবন এবং আশপাশের এলাকায় সার্বক্ষণিকভাবে অন্তত দেড় শতাধিক পুলিশ ও গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন থাকবেন। যদি তিনি বাসভবনের বাইরে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেন, তবে সেই নিরাপত্তা বহরে তিন শতাধিক সদস্য যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় তদারকি ও বিশেষ নির্দেশনা ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শাহরিয়ার আলী জানিয়েছেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং এটি সরাসরি সদরদপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে।
অন্যদিকে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রওনক আলম জানান, পুলিশ সদরদপ্তরের বিশেষ নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যদেরও এই নিরাপত্তা বলয়ে সমন্বিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাসভবন ও রাজনৈতিক কার্যালয় ঘিরে তৎপরতা তারেক রহমান দেশে ফেরার পর গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯শে নম্বর বাসায় উঠবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বাসাটি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’র ঠিক পাশেই অবস্থিত। নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে এই দুটি বাসা এবং গুলশান ৮৬ নম্বর রোডের দলীয় কার্যালয়কে একই নিরাপত্তা জোনের আওতায় আনা হয়েছে।
তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ও প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জন্য সর্বোচ্চ মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিএসএফ ও পুলিশ একযোগে কাজ করছে।
বিমানবন্দরে বিশেষ কড়াকড়ি নেতাকর্মীদের ব্যাপক সমাগম এবং নিরাপত্তা শৃঙ্খলার স্বার্থে আজ বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ছাড়া অন্য সবার প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ও অপারেশনাল শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। উল্লিখিত সময়ে শুধুমাত্র বৈধ টিকিটধারী যাত্রীরাই বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন।
দীর্ঘ সময় পর তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিএনপির পক্ষ থেকেও স্মরণীয় আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সারা দেশ থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মীর ঢাকায় আগমনের সম্ভাবনা থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জননিরাপত্তার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। মূলত তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

