ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার বঙ্গবন্ধু সরণিতে অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন ঘেরাও করে তা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) দলীয় সমর্থকদের নিয়ে উপ-হাইকমিশনের সামনে অবস্থান নিয়ে তিনি এই বিতর্কিত ও উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। মূলত বাংলাদেশের ময়মনসিংহে এক হিন্দু যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিজেপি।
হাইকমিশনের সামনে আয়োজিত এই প্রতিবাদ সমাবেশে শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, “ময়মনসিংহে দীপু দাস নামক এক যুবককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আমরা কলকাতায় বাংলাদেশের এই উপ-হাইকমিশন আর থাকতে দেব না। এই কার্যালয় অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে হবে এবং এতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।” তার এই বক্তব্যের সময় উপস্থিত সমর্থকদের ধর্মীয় স্লোগান দিতে দেখা যায়, যা পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
শুভেন্দু অধিকারী কেবল উপ-হাইকমিশন বন্ধের হুমকিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং আগামী কয়েকদিনের জন্য বড় ধরনের আন্দোলনের কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, আগামী ২৪ ডিসেম্বর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতীকী হিসেবে এক ঘণ্টার জন্য অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।
এ ছাড়াও ২৬ ডিসেম্বর আবারও কলকাতায় বড় আকারের জমায়েত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে একটি বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের সুরক্ষা নিয়ে এমন হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
উত্তেজনার মূলে থাকা ময়মনসিংহের ভালুকার সেই ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সেখানে দীপু দাস নামক এক ব্যক্তি পিটুনির শিকার হন এবং পরবর্তীতে তার মৃত্যু হয়। তবে বাংলাদেশ সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন এই ঘটনায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ইতিমধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার ময়মনসিংহের ৮নং আমলি আদালতের সিনিয়র চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহাদাত হোসেন গ্রেপ্তারকৃতদের প্রত্যেককে তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন যাতে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নেপথ্যে থাকা অপরাধীদের চিহ্নিত করা যায়।
রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামিদের তালিকায় রয়েছেন আশিকুর রহমান, কাইয়ুম, লিমন সরকারসহ আরও বেশ কয়েকজন যুবক। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। অথচ বাংলাদেশে যখন আইনি প্রক্রিয়া চলমান, তখন প্রতিবেশী দেশে রাজনৈতিক স্বার্থে এই ঘটনাকে ব্যবহার করে কূটনৈতিক কার্যালয় বন্ধের হুমকি দেওয়াকে অনভিপ্রেত বলে মনে করছেন কূটনীতিবিদরা।
কলকাতার এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্থানীয় পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী যেকোনো দেশের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট স্বাগতিক দেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা।
শুভেন্দু অধিকারীর এই উসকানিমূলক বক্তব্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সীমান্ত অবরোধের ঘোষণায় দুই দেশের মধ্যকার আমদানি-রপ্তানি ও যাত্রী পারাপার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

