অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ ‘বিগ ব্যাশ’-এর ইতিহাসে আজ এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণ রচিত হলো, যা ক্রিকেট বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ব্রিসবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে রান উৎসবের এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য লিখেছে স্বাগতিক ব্রিসবেন হিট। পার্থ স্করচার্সের ছুঁড়ে দেওয়া ২৫৮ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করে শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। ব্যাট-বলের এই বিধ্বংসী লড়াইয়ে দুই ইনিংস মিলিয়ে স্কোরবোর্ডে উঠেছে সর্বমোট ৫১৫ রান, যা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম রোমাঞ্চকর এক লড়াই হিসেবে নথিবদ্ধ হলো।
ম্যাচটিতে ব্রিসবেন হিটের হয়ে অভিষেক মৌসুম পার করা পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি ব্যক্তিগতভাবে সফল হতে না পারলেও, তার দল গড়েছে নতুন ইতিহাস। শাহিন আজ তার নির্ধারিত ৪ ওভারে ১২.২৫ গড়ে ৪৯ রান খরচ করেছেন। এটি তার টানা দ্বিতীয় ম্যাচে খরুচে বোলিংয়ের রেকর্ড, যেখানে প্রথম ম্যাচেও তিনি মাত্র ২.৪ ওভারে ৪৩ রান দিয়েছিলেন। তবে বোলিং ইউনিটের এই ব্যর্থতা ঢেকে দিয়েছেন ব্রিসবেনের ব্যাটাররা, বিশেষ করে জ্যাক উইল্ডারমুথ ও ম্যাট রেনশর অতিমানবীয় দুটি সেঞ্চুরি।
এদিন টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় পার্থ স্করচার্স। যদিও শুরুটা তাদের জন্য সুখকর ছিল না, দলীয় মাত্র ৮ রানেই অভিজ্ঞ মিচেল মার্শকে হারিয়ে হোঁচট খায় দলটি। তবে সেই বিপর্যয় সামাল দিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ১৪২ রানের বিধ্বংসী জুটি গড়েন ফিন অ্যালেন ও কপার কনলি। কনলি ৩৭ বলে ৭৭ রানের এক ঝড়ো ইনিংস খেলেন, যাতে ছিল ৬টি চার ও ৬টি ছক্কার মার। অন্যদিকে ফিন অ্যালেন ছিলেন আরও বেশি আগ্রাসী; মাত্র ৩৮ বলে ৩টি চার ও ৮টি ছক্কায় তিনি ৭৯ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন। শেষদিকে অ্যারন হার্ডি ও নিক হবসনদের ছোট কিন্তু কার্যকর ক্যামিওতে নির্ধারিত ২০ ওভারে পার্থ স্করচার্স ২৫৭ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায়। ব্রিসবেনের বোলারদের মধ্যে জাভিয়ের বার্টলেট ৪৪ রানে ২ উইকেট নিলেও বাকিরা ছিলেন মূলত দর্শক।
২৫৮ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ব্রিসবেন হিটের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ইনিংসের প্রথম বলেই শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন অধিনায়ক কলিন মুনরো। সেই মুহূর্তে গাব্বার গ্যালারিতে স্তব্ধতা নেমে এলেও রূপকথা লেখা তখনও বাকি ছিল। দ্বিতীয় উইকেটে জুটি বাঁধেন জ্যাক উইল্ডারমুথ ও ম্যাট রেনশ। এই দুই ব্যাটারের ব্যাটে পার্থের বোলাররা রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েন। তারা কেবল ম্যাচ বাঁচাননি, বরং ২১২ রানের এক রেকর্ড গড়া জুটি উপহার দেন। ম্যাট রেনশ ৫১ বলে ৫টি চার ও ৯টি ছক্কায় ১০২ রানের এক দর্শনীয় ইনিংস খেলে আউট হলেও, অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন উইল্ডারমুথ। তিনি ৫৪ বলে ৫টি চার ও ৯টি ছক্কার সাহায্যে ১১০ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।
বিগ ব্যাশের দীর্ঘ পথচলায় এর আগে সর্বোচ্চ ২৩০ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডটি ছিল অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের দখলে, যা তারা ২০২৩ সালে হোবার্ট হারিকেন্সের বিপক্ষে গড়েছিল। আজ সেই রেকর্ড চুরমার করে দিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল ব্রিসবেন হিট। তবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান তাড়া করার রেকর্ডটি এখনো দক্ষিণ আফ্রিকার দখলে, যারা ২০২৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৫৯ রান তাড়া করে জিতেছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের আইপিএলে পাঞ্জাব কিংস ২৬২ রান তাড়া করে জেতার বিশ্বরেকর্ডটিও আজ আলোচনায় ফিরে এসেছে।
এই জয়ের ফলে ব্রিসবেন হিট কেবল পয়েন্ট তালিকায় সুবিধাজনক অবস্থানেই গেল না, বরং বিশ্বের ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে নিজেদের শক্তির বার্তাও পৌঁছে দিল। বিশেষ করে ব্রিসবেনের ব্যাটাররা যেভাবে পেসার শাহিন আফ্রিদি কিংবা হার্ডির মতো বোলারদের মোকাবিলা করেছেন, তা ঘরোয়া ক্রিকেটের মানকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। শাহিন আফ্রিদি উইকেট পেলেও তার লাইন-লেন্থ ও রান দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তবে দলের অবিশ্বাস্য জয় সব সমালোচনাকে আপাতত ছাপিয়ে গেছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, আজকের এই ৫১৫ রানের ম্যাচ প্রমাণ করে যে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এখন পুরোপুরি ব্যাটারদের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। যেখানে ২৫০-এর বেশি রানও এখন আর নিরাপদ নয়। গাব্বার এই ঐতিহাসিক রাত ব্রিসবেনের ভক্তরা অনেক দিন মনে রাখবেন, কারণ অসম্ভবকে সম্ভব করার নতুন এক সংজ্ঞা আজ ক্রিকেট বিশ্বকে দেখালো জ্যাক উইল্ডারমুথ ও ম্যাট রেনশর জুটি।

