ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির অকাল প্রয়াণে শোক ও ক্ষোভের যে আগুন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায়। গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণাকালে বর্বরোচিত হামলার শিকার হওয়া এই তরুণ নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানী জুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জেরে গতরাতের পর আজ শুক্রবার সকালেও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরস্থ শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে পুনরায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানে জড়ো হয়ে স্লোগান ও ভাঙচুরের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রদর্শন করছেন।
আজ সকালে সরেজমিনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ ওই বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়েছেন। ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিক্ষুব্ধ জনতা বড় হাতুড়ি নিয়ে বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং তিনটি ফ্লোরেই ব্যপক ভাঙচুর চালান। এ সময় অনেককে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘৩২ এর আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। উপস্থিত জনতা এই বাড়িটিকে ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করে তাদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। তাদের দাবি, শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার নির্দেশদাতা ও হত্যাকারীদের নেপথ্যে যে রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে, তাদের দম্ভ চূর্ণ করতেই এই প্রতিবাদ।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে, যখন সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর বাংলাদেশে পৌঁছায়। খবরটি পাওয়ামাত্রই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। গভীর রাতেই একটি বিশাল মিছিল ধানমন্ডি এলাকায় প্রবেশ করে এবং ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাঙচুর শুরু করে। রাতভর উত্তজনা চলার পর আজ সকালে আবারও জনতা সেখানে সমবেত হয়ে ভাঙচুর অব্যাহত রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিত থাকলেও উত্তেজিত জনতার স্রোতের মুখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে।
শরীফ ওসমান হাদি কেবল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্রই ছিলেন না, বরং ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফেরার পথে চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল ও পরবর্তীতে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সরকারি উদ্যোগে তাকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। মাথায় বিঁধে থাকা বুলেটের ক্ষত আর শারীরিক জটিলতার কারণে গতকাল রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
হাদির মরদেহ আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে আনার কথা রয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে (বিজি ৫৮৫) সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে হাদির নিথর দেহ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করা হবে। সব ঠিক থাকলে সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে হাজার হাজার সমর্থক ও রাজনৈতিক কর্মী সমাবেত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও জনমানসে থাকা তীব্র ক্ষোভের কারণে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে আছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই ঘটনাকে অনেকেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। হাদির মৃত্যু দেশীয় রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে এবং এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমনে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হচ্ছে। আগামীকাল তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

