হিমালয় কন্যা নেপালের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া কেপি শর্মা অলি আবারও তার রাজনৈতিক দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্টের (সিপিএন-ইউএমএল) প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত দলীয় সম্মেলনে এক বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করে তিনি তার নেতৃত্ব পুনর্নিশ্চিত করেছেন। এই জয়ের ফলে আগামী বছরের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেবেন ৭৩ বছর বয়সী এই ঝানু রাজনীতিবিদ।
নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির প্রচার বিভাগের প্রধান রাজেন্দ্র গৌতমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনব্যাপী চলা এই সাধারণ সম্মেলনে অলির পক্ষে একচেটিয়া সমর্থন দেখা গেছে। দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে অলি তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ঈশ্বর পোখরেলের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ভোট পেয়েছেন।
গণনায় দেখা গেছে, অলি পেয়েছেন ১ হাজার ৬৬৩ ভোট, যেখানে পোখরেল পেয়েছেন মাত্র ৫৬৪ ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় প্রমাণ করে যে সরকার থেকে অপসারিত হলেও দলের তৃণমূল ও শীর্ষ নেতৃত্বে অলির প্রভাব এখনো প্রশ্নাতীত।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া গণ্ডকি প্রদেশের ৪৫ বছর বয়সী নারী প্রতিনিধি তারা মায়া থাপা মাগার তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “নেপাল বর্তমানে যে রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তা থেকে দেশকে উত্তরণ ঘটাতে অলির মতো অভিজ্ঞ নেতার কোনো বিকল্প নেই।” তিনি আরও দাবি করেন যে, সেপ্টেম্বরের সেই উত্তাল আন্দোলন মূলত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ফলাফল ছিল এবং অলিই পারেন দেশকে আবারও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে এক ভয়াবহ জনবিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মূলত সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত থেকে এই অসন্তোষের সূত্রপাত। ধীরে ধীরে তা দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক বিশাল গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল তরুণ প্রজন্ম, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের বিদ্রোহ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সেই বিক্ষোভ চলাকালীন অন্তত ৭৭ জন মানুষ প্রাণ হারান এবং ক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে চারবারের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের পথ প্রশস্ত করতেই তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তার বিদায়ের পর নেপালের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে নেপালের দায়িত্বে থাকা সুশীলা কার্কির তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসন আগামী মার্চের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে অলির জন্য পথটি খুব একটা মসৃণ নয়। আন্দোলন চলাকালীন বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নে অলির সম্ভাব্য ভূমিকা তদন্ত করতে বর্তমানে একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি কমিশন কাজ করছে। এই তদন্তের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার অলি এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও অলি নিজেকে দলের ‘সর্বোচ্চ অভিভাবক’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছেন। তার সাম্প্রতিক সমাবেশগুলোতে ‘কেপি বাবা, আমরা তোমাকে ভালোবাসি’ সংবলিত পোস্টার ও ব্যানার দেখা গেছে, যা তার প্রতি সমর্থকদের একনিষ্ঠ আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। দলীয় প্রধান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর অলি এক সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল দেশ গড়ার নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
নেপালের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটা অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে। একদিকে অলির মতো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান, অন্যদিকে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মধ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি বারবার আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি একটি ‘ন্যায়সঙ্গত ও ভয়মুক্ত’ পরিবেশ নিশ্চিত করবেন, যেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের রায় দিতে পারবেন।
৫ মার্চের নির্বাচন নেপালের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, অলি যদি এই আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেন, তবে তা হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে অন্যতম বড় চমক। তবে তরুণ প্রজন্ম এই প্রত্যাবর্তনকে কীভাবে গ্রহণ করবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

