দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ এখন এক পূর্ণাঙ্গ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে কম্বোডিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ক্যাসিনো হাব হিসেবে পরিচিত পোইপেট শহরে থাই বিমানবাহিনীর বোমা হামলায় পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
গত ৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই নতুন দফার সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের অন্তত ৫২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সেনাসদস্য ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, এই যুদ্ধের প্রভাবে দুই দেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলো থেকে অন্তত ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে থাইল্যান্ডের একজোড়া এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমান পোইপেট মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় দুটি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করে। এই এলাকাটি মূলত থাই পর্যটক ও জুয়ারিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ক্যাসিনো অঞ্চল এবং দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তম স্থলবন্দর।
কম্বোডিয়ার দাবি, এই হামলা সরাসরি বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তবে থাইল্যান্ডের বিমানবাহিনী এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা পোইপেটের বাইরে একটি সুনির্দিষ্ট ‘লজিস্টিক সেন্টার’ লক্ষ্য করে এই অভিযান চালিয়েছে। থাই সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ওই স্থাপনাটি কম্বোডীয় বাহিনীর রকেট সিস্টেম এবং অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। থাইল্যান্ডের দাবি, এই হামলায় কোনো বেসামরিক নাগরিক হতাহত হননি।
এই সংঘাতের পেছনে থাইল্যান্ড একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্যাংককের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা কেবল সীমান্ত রক্ষার লড়াই করছে না, বরং কম্বোডিয়ার এই ক্যাসিনো হাবগুলোতে ঘাঁটি গেড়ে বসা আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী ও অনলাইন স্ক্যামারদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। থাই সামরিক বাহিনীর মতে, পোইপেটের অনেক ক্যাসিনো এখন ড্রোন কমান্ড সেন্টার এবং অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। তবে কম্বোডিয়া এই দাবিকে আগ্রাসন আড়াল করার অজুহাত হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছে।
সীমান্তের এই রণক্ষেত্র থেকে আসা তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সুরাসান্ত কংসিরি রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তাদের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো থেকে ৪ লাখেরও বেশি মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে কাজ করছে। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যালি সোচিয়েতা জানিয়েছেন, দেশটির অন্তত পাঁচটি সীমান্ত প্রদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার নাগরিককে সরকারি শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের মোট সংখ্যা বর্তমানে ৮ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
সীমান্তের এই লড়াইয়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন’ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে ১ হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্তত আড়াই লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। আশ্রয়শিবিরগুলোতে বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং চরম মানসিক ট্রমা বা মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই বছরের শুরু থেকেই থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গত অক্টোবর মাসে মালয়েশিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উপস্থিতিতে দুই দেশ একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ৭ ডিসেম্বর সীমান্তে একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে থাই সেনার মৃত্যু এবং তার পরপরই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণে সেই চুক্তি কার্যত ভেস্তে যায়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ দূত পাঠিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতির লক্ষণ দেখা যায়নি।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চারণভিরাকুল স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হচ্ছে, ততক্ষণ সীমান্তে এই সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, কম্বোডিয়া তাদের ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতা’ রক্ষার শপথ নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং আসিয়ান (ASEAN) উভয় পক্ষকেই বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে আসিয়ান পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও বাস্তবে সংঘাত থামানোর মতো শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত কেবল দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি এবং পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পোইপেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। থাইল্যান্ডে কর্মরত প্রায় ২০ লাখ কম্বোডীয় অভিবাসী শ্রমিকের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক রেমিট্যান্স প্রবাহও হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমানে সীমান্তের ও’বেই কোহান এবং প্রে চান এলাকায় ভারী গোলাবর্ষণ চলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশঙ্কা করছে যে, যদি অতি দ্রুত কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো না যায়, তবে এই সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের ওপরেও এর আঁচ লাগতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই শান্তিপ্রিয় অঞ্চলটি এখন যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নিরপরাধ নাগরিকদের।

