বিশ্ব রাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা দেশগুলোর রণকৌশল এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি সংক্রান্ত বক্তব্যকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি বড় মাপের যুদ্ধের যে আবহ তৈরি করা হচ্ছে, তাকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’, ‘মিথ্যা’ এবং এক ধরনের ‘সামাজিক উন্মাদনা’ বা ‘হিস্টেরিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।
বুধবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকে বক্তব্য রাখার সময় পুতিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে এই কড়া বার্তা দেন। তার এই বক্তব্যে একদিকে যেমন পশ্চিমাদের প্রতি কঠোর সমালোচনা ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের একটি স্পষ্ট রূপরেখাও পরিলক্ষিত হয়েছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেওয়া এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের নানা সমীকরণ আলোচিত হচ্ছে।
মস্কোতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পুতিন অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, পশ্চিমা কতিপয় নেতা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের যে আহ্বান জানাচ্ছেন, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে অহেতুক ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই এই ধরনের প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য।
পুতিন সাফ জানিয়ে দেন, রাশিয়া কোনোভাবেই এই উত্তেজনাকে অনর্থক বাড়িয়ে তোলার পক্ষে নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা নেতাদের এই ধরনের অবস্থানকে ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরিবর্তে সংঘাতের উস্কানি দেওয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বৈঠকের মূল সুর ছিল রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইউক্রেন ইস্যুতে নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখা।
ইউক্রেন সংকট নিরসনে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পুতিন এক চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, শান্তি আলোচনার পথ যদি ইউক্রেন এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের পক্ষ থেকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তবে রাশিয়া তার লক্ষ্য অর্জনে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না।
পুতিন উল্লেখ করেন যে, ইউক্রেন বর্তমানে যেসব ভূখণ্ড রাশিয়ার বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হয়, তবে মস্কো সামরিক উপায়েই সেই অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে একটি গভীর বার্তার মতো কাজ করেছে যে, মস্কো কেবল আলোচনার টেবিলেই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রেও তার শক্তি প্রদর্শনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। পুতিনের এই কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, রাশিয়ার দাবি করা অঞ্চলগুলোর বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করতে তারা নারাজ।
বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি। প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সেনাবাহিনীর জেনারেল ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, ইউক্রেন সংঘাতের ময়দান থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন নতুন অস্ত্রের উদ্ভাবন করতে হবে।
বিশেষ করে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ভূমিকা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইলেকট্রনিক সমরাস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। পুতিনের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রই হলো গবেষণাগার, আর সেখান থেকে পাওয়া শিক্ষা রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম শক্তিতে পরিণত করতে সহায়তা করবে। তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাশিয়ার কূটনৈতিক অবস্থানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আওতায় ইউক্রেনে ইউরোপীয় সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে রাশিয়ার মনোভাব স্পষ্ট করেন তিনি। পেসকভ জানান, ইউক্রেনের ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের বিদেশি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের সংবেদনশীল বিষয়।
তিনি বলেন যে, ইউক্রেনে বিদেশি সৈন্য মোতায়েনের বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান দীর্ঘকাল ধরেই অত্যন্ত পরিষ্কার এবং এটি আন্তর্জাতিক মহলের অজানা নয়। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে, যদি সেটি রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। পেসকভের এই মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি সরাসরি সংঘাতের বদলে একটি কূটনৈতিক জানালা খোলা রাখার ইঙ্গিত দেয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে জল্পনা চলছে, তখন পেসকভ সেই বিষয়ে রাশিয়ার দ্বিমত পোষণ করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত একটি পরিকল্পনার আওতায় ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা পাবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউরোপের নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে পশ্চিম ইউক্রেনে মোতায়েন করা হতে পারে, যারা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ না নিলেও ইউক্রেনীয় বাহিনীকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করবে। এই প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পেসকভ অত্যন্ত কৌশলী উত্তর দেন।
তিনি বলেন যে, কূটনীতি এবং পর্দার অন্তরালের আলোচনা সম্পর্কে তিনি গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইউক্রেনের মাটিতে বিদেশি সেনার অবস্থান কখনোই রাশিয়ার কাছে ইতিবাচক বিষয় হিসেবে গণ্য হবে না।
পেসকভ আরও উল্লেখ করেন যে, রাশিয়ার অবস্থান একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বোধগম্য। রাশিয়া চায় না তার প্রতিবেশী কোনো দেশে বিদেশি শক্তির সামরিক ঘাঁটি বা উপস্থিতি থাকুক, যা সরাসরি রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি বলেন, “ইউক্রেনের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক বাহিনীর বিষয়ে আমাদের অবস্থান আপনারা সবাই জানেন।
এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তবে আমরা আলোচনার টেবিলে যেকোনো যৌক্তিক প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারি।” পেসকভের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, রাশিয়া একদিকে যেমন তার প্রতিরক্ষা প্রাচীর মজবুত রাখছে, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর একটি ক্ষীণ আশাও জিইয়ে রাখছে। এটি রাশিয়ার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশলের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মস্কো সফরের কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও নিশ্চিত করেন ক্রেমলিন মুখপাত্র। তিনি জানান যে, রাশিয়া বর্তমানে মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইউক্রেন সংকটের সমাধান নিয়ে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অপেক্ষায় রয়েছে।
পেসকভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখনই আলোচনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নিয়ে এগিয়ে আসবে, তখনই মস্কোকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে। রাশিয়া আশা করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবতার নিরিখে আলোচনার ফলাফল মস্কোর সামনে উপস্থাপন করবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে পেসকভ মূলত রাশিয়ার একটি অপেক্ষমান নীতির কথা জানান দিলেন, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে।
সামগ্রিকভাবে, প্রেসিডেন্ট পুতিনের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং ক্রেমলিনের সুশৃঙ্খল কূটনৈতিক অবস্থান এটিই প্রমাণ করে যে, রাশিয়া তার জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। পশ্চিমাদের ‘যুদ্ধের হিস্টোরিয়া’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুতিন মূলত বিশ্বের দরবারে রাশিয়াকে একটি শান্তিকামী কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন।
একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণের নির্দেশ দিয়ে তিনি ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বার্তা দিয়েছেন যে, রাশিয়া যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি। ইউক্রেন সংকটের জল এখন কোন দিকে গড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে কি না, তা নিয়ে সারা বিশ্বের নজর এখন মস্কো এবং ওয়াশিংটনের দিকে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে পুতিনের এই মন্তব্যগুলো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

