রাজধানীর সচিবালয়ের ভেতরে কূটনৈতিক করিডোর আর অফিশিয়াল প্রটোকলের ব্যস্ততা ছাপিয়ে এবার নতুন এক উষ্ণতার বার্তা এল ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বাণিজ্যে। দুই দেশের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতার খাতায় আটকে নেই, বরং তা আরও গভীর ও সুদৃঢ় হচ্ছে।
রোববার বিকেলে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে কৃষি বাণিজ্যের নানা দিক উঠে আসে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে।
রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্যে জানান যে, খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের সাথে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক একটি আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য খাতের এই সহযোগিতাই দুই দেশের সম্পর্ককে প্রতিনিয়ত মজবুত করছে।
আমেরিকা থেকে পাঠানো লাখ লাখ টন শস্য ও কৃষিপণ্য যে আজ বাংলাদেশের খাদ্যপাচীরে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তা সগর্বে উল্লেখ করেন মার্কিন এই শীর্ষ কূটনীতিক। দুই দেশের বাণিজ্যের এই রসায়ন সাধারণ মানুষের হেঁসেল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইতিমধ্যে দুই লাখ টনেরও বেশি উন্নত মানের গম এবং বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যশস্য বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে। এই শস্যগুলো কেবল মানুষের খাদ্যচাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং পশুখাদ্য হিসেবেও অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আমদানিকৃত এই মার্কিন গম ও শস্যের সুবাদে দেশের সাধারণ মানুষের পুষ্টির মৌলিক চাহিদা পূরণের পথ যেমন আরও সুগম হয়েছে, তেমনি সামগ্রিক আমদানির খরচও অনেকটাই কমে এসেছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
খরচ সাশ্রয়ী ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন এই খাদ্যপণ্য আমদানি প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সমঝোতা। ফসলের মাঠ থেকে শুরু করে বড় বড় গুদাম পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই সাপ্লাই চেইন আজ দুই দেশের আস্থার প্রতীক।
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের সাথে এই বৈঠকে মূলত কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত স্বচ্ছতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের নানা ওঠানামা থাকলেও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ ব্যবসা ও বাণিজ্য তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলেছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই যৌথ প্রয়াস প্রমাণ করে যে সংকটেও একে অপরের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত ঢাকা ও ওয়াশিংটন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের এই নতুন দিগন্ত দুই দেশের অর্থনীতিকেই সমানভাবে উপকৃত করছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে মার্কিন কৃষিপণ্যের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির বীজ ও কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রও আরও প্রশস্ত হবে।
বৈঠকের শুরুতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময় হয়। বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় যৌথ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্য মজুত পরিস্থিতি এবং সরকারের জনকল্যাণমুখী খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করেন। স্বচ্ছতা বজায় রেখে কীভাবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে, তাও তুলে ধরা হয়।
উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের গুদামগুলোতে মার্কিন গমের গুণগত মান নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রতিযোগিতামূলক দামে এই গম পাওয়ায় দেশের বেকারারি ও ময়দা শিল্প নতুন জীবন পেয়েছে।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই সুদৃঢ় ভিত্তি কেবল গম আমদানির মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। আগামী দিনে জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ শক্তিতেও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের বাস্তবমুখী ও কর্মক্ষম দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাত্ত্বিক কূটনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে তিনি বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি তাই কেবল একটি রুটিন সাক্ষাৎ ছিল না; বরং এটি ছিল দুই দেশের বন্ধুত্বের চাকা সচল রাখার এক নিভৃত ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রয়াস।
বাংলাদেশ সরকার দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুষ্টির মান বাড়াতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মার্কিন কৃষিপণ্যের এই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এক বড় ধরণের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
আমদানিকৃত মার্কিন শস্যের মান যাচাইয়ের জন্য কাস্টমস ও খাদ্য পরিদর্শকদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। কোনো ধরনের নিম্নমানের পণ্য যেন বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার শুরু থেকেই অত্যন্ত কঠোর।
ভবিষ্যতে দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সফর ও বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন উভয় পক্ষ। ছোট ও মাঝারি শিল্পে মার্কিন সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও ডলার সংকটের এই সময়ে সাশ্রয়ী মূল্যে মার্কিন গম ও খাদ্যশস্য প্রাপ্তি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করেছে। এই অর্থনৈতিক স্বস্তি নীতিনির্ধারকদের বড় স্বস্তি দিচ্ছে।
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম আশা প্রকাশ করেছেন যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই ইতিবাচক মনোভাব আগামী দিনে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনও তাঁর বিদায়ের আগে কিংবা কার্যকালের বাকি সময়ে বাংলাদেশের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে ব্যক্তিগতভাবে সচেষ্ট রয়েছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতেও এই বৈঠকের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়েছে। সেখানে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা এবং পুষ্টির চাহিদা মেটানোর এই যৌথ পথচলা প্রমাণ করে যে, রাজনীতি কিংবা ভূরাজনীতির বাইরেও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তিই আসল কূটনীতি।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের এই নিবিড় বাণিজ্যিক মিতালি আগামী দিনে কেবল সরকারি পর্যায়ে নয়, বরং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট মহলের।
সচিবালয়ের এই ছোট্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত দুই দেশের বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়েই ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে, আর এখন আমদানি খাতেও সহযোগিতা বাড়ার লক্ষণ স্পষ্ট।
কৃষি খাতের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, এবং সেই আধুনিক জ্ঞান ও উন্নত জাতের শস্যের সুফল বাংলাদেশের কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং মার্কিন দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এ দেশের কৃষিবিদদের দক্ষতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বৈঠক শেষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত যখন গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন, তখন তাঁর সাবলীল ও আন্তরিক ভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল যে দুই দেশের মধ্যকার আস্থার মাত্রাটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে।
খাদ্যপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন এই সরবরাহ চেইন বজায় রাখতে দুই দেশের কাস্টমস ও পোর্ট অথরিটিগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।
আমদানিকৃত শস্য খালাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াও মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই যখন কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তখন এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক চুক্তি জীবনরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের এই ধরনের অংশীদারিত্ব অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
ভবিষ্যতের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় খাদ্য নিরাপত্তা যে যেকোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রধান শর্ত, তা আজকের এই বৈঠকের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।
দুই দেশের বাণিজ্যের এই পরিধি কেবল খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও সম্প্রসারণের দারুণ সুযোগ রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মার্কিন এই প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে।
উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের এই ধরনের পারস্পরিক বোঝাপড়া ভবিষ্যতে বৈশ্বিক যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এক শক্তিশালী বর্ম হিসেবে কাজ করবে।
বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ভবিষ্যতের যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে খাদ্য সংরক্ষণাগারগুলো পূর্ণ রাখার বিকল্প নেই, আর তাই মার্কিন শস্য আমদানি প্রক্রিয়াটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ও আফরোজা খানমের এই ফলপ্রসূ বৈঠক বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক নতুন এবং আশাবাদী অধ্যায়ের সূচনা করল।

