মরুভূমির দেশে নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে রক্তহিম করা এক নিষ্ঠুর পরিণতি বরণ করতে হয়েছে দুই বাংলাদেশি প্রবাসীকে।
সৌদি আরবে সেই দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবরের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক পাড়ায়।
এই চরম ও বেদনাদায়ক ঘটনায় দূতাবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কনস্যুলার কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা গাফিলতি ছিল কি না, তা এবার কঠোরভাবে খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের স্থায়ী কমিটির সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি ও উত্তপ্ত বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিত ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী।
প্রবাসী কর্মীদের মৌলিক নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোর সেবা প্রদানের মান নিয়ে কমিটির সদস্যরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্থায়ী কমিটিকে জানানো হয় যে, দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে কার্যকর করা হয়েছে, তা জানতে রিয়াদস্থ সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
বিষয়টি শোনার পর সংসদীয় কমিটি স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে যে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ বিবরণ সংসদীয় কমিটির টেবিলে পেশ করতে হবে।
একই সাথে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে মন্ত্রণালয় কী কী বাস্তবমুখী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তা-ও জানাতে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ায় সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা কনস্যুলেটের কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্যও কমিটিকে জানাতে সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদেশে থাকা শ্রমজীবী প্রবাসীদের জন্য সরকারি মিশনগুলোর সেবার মান আধুনিকায়ন করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সামগ্রিক কৌশলপত্র আগামী বৈঠকে উপস্থাপনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও স্পর্শকাতর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অংশ নেন সংসদীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এস কে আজিজুল বারী, সাঈদ আল নোমান, হুমাম কাদের চৌধুরী এবং সানজিদা ইসলাম।
কমিটির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির তীব্রতা ও সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বিশেষ আমন্ত্রণে ওই জরুরি বৈঠকে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকের শুরুতেই স্থায়ী কমিটির ২য় বৈঠকের কার্যবিবরণী আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়।
একই সাথে পূর্ববর্তী বৈঠকগুলোতে নেওয়া নানাবিধ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে এক এক করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন উপস্থিত সাংসদেরা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক কিছু বড় কূটনৈতিক অর্জনের প্রসঙ্গের কথা উঠে আসে বৈঠকের শুরুতেই।
১৫৩তম আইপিইউ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সম্মানিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
একই সাথে স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী নিজে আইপিইউ-এর নির্বাহী কমিটির মর্যাদাপূর্ণ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার জন্য তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়।
সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির সদস্যরা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সরেজমিনে পরিদর্শনে যান।
সেই বিশেষ সফর সফল করতে সার্বিক প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করায় পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রতি সাধুবাদ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা।
কক্সবাজার সফরের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনার পর বৈঠকের মূল আলোচনা ঘুরে যায় সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর বর্তমান জনবল ও সার্বিক কার্যকারিতার ওপর।
সেই সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র ও প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রেজেন্টেশনে স্থান পায় রিয়াদ ও জেদ্দায় কর্মরত মিশনগুলোর মূল কার্যক্রম, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মসংস্থান ও ব্যাংক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহের সুনির্দিষ্ট চিত্র।
একই সাথে তেলের ওপর নির্ভরশীল মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের বর্তমান বড় চ্যালেঞ্জ, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষার ঘাটতি এবং শ্রমকল্যাণ পরিষেবার নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রণালয়।
রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল কীভাবে আমাদের প্রবাসী কর্মীদের শ্রমকল্যাণমূলক সেবা প্রদান করে থাকে, তারও একটি হিসাব দেওয়া হয়।
বাৎসরিক পবিত্র হজ ব্যবস্থাপনা ও হজ গমনেচ্ছু হাজীদের সেবায় নিয়োজিত প্রশাসনিক দলগুলোর সার্বিক কার্যক্রমের সুবিধাদি নিয়েও সংসদীয় কমিটিকে অবগত করা হয়।
সব তথ্য বিশ্লেষণ করার পর সংসদীয় কমিটি এক সুনির্দিষ্ট সুপারিশে জানায় যে, কেবল পুরুষ কর্মী নয়, সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে অগ্রাধিকার পেতে হবে।
কাজের বুয়া ও বাসাবাড়িতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকেরা যেভাবে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, তা বন্ধে বিদেশি নিয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়।
শ্রমিকেরা বিপদে পড়ে দূতাবাসে ফোন করলে বা আশ্রয় চাইলে যেন সাথে সাথে আইনি ও মানবিক সুরক্ষা পান, সেই ডেডিকেটেড হেল্পলাইন ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার সুপারিশ করা হয়।
পররাষ্ট্র স্থায়ী কমিটির এই জরুরি বৈঠকে সচিবসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উর্ধ্বতন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
মরুভূমির দেশে রক্ত ঝরানো দুই প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীর এমন করুণ পরিণতি দেশের সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের বুকেও এক গভীর আঘাত হেনেছে।
প্রবাসীরা মাসের পর মাস প্রবাসে কষ্ট করে যে কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স দেশে পাঠান, তার বিনিময়ে বিপদকালে তারা রাষ্ট্র ও কনস্যুলেট থেকে ন্যূনতম আইনি সহায়তা পাচ্ছেন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিদেশের মাটিতে বিচারে মৃত্যুদণ্ড বা কড়া সাজা হওয়া প্রবাসীদের আইনি লড়াই চালাতে যে রাষ্ট্রীয় তহবিল থাকার কথা, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
অনেক সময়ই দোভাষীর অভাব কিংবা প্রবাসী শ্রমিকদের আরবি ভাষা না জানার কারণে স্থানীয় সৌদি আদালতে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পান না সাধারণ শ্রমিকেরা।
আইনি সহায়তার এই ঘাটতি কাটাতে রিয়াদ ও জেদ্দায় স্থানীয় প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইনজীবিদের প্যানেল নিয়োগ করার জোর দাবি দীর্ঘদিনের।
যদি কনস্যুলার কর্মকর্তাদের চরম আলসেমি বা উদাসীনতার কারণেই দুই বাংলাদেশিকে ফাঁসির কাষ্ঠে বা তরবারির নিচে যেতে হয়, তবে তা হবে চরম ক্ষমার অযোগ্য এক মানবিক অপরাধ।
সংসদীয় কমিটি যেভাবে এই বিষয়ে এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে সরাসরি তদন্তের নির্দেশ দিল, তা প্রবাসীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত কোটি বাংলাদেশি এখন মুখিয়ে আছেন সংসদীয় কমিটির এই কঠোর সুপারিশের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তোকিও-রিয়াদের মিশনগুলো কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নেয় তা দেখার জন্য।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দ্রুততম সময়ে প্রবাসীদের দরজায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার নামই হোক কনস্যুলার সার্ভিস—সংসদ ভবনের সভাকক্ষ থেকে উঠে আসা বার্তাটি এখন এটাই।
প্রবাসী প্রতিটি কর্মীর জীবন ও সম্মান রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সেই চিরন্তন সত্যটিই যেন আরেকবার প্রদীপ্ত হয়ে উঠল জাতীয় সংসদের এই উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনায়।
দুই তাজা প্রানের বিনিময়ে হলেও আমাদের পররাষ্ট্র নীতি এবং প্রবাসী মিশনগুলোর ঘুম যেন ভাঙে, সেটাই এখন পুরো দেশের সাধারণ মানুষের একমাত্র দাবি।

