কক্সবাজারের নয়নাভিরাম ও শান্ত হিমছড়ি সমুদ্র সৈকতের রূপ এক মুহূর্তেই রূপ নিল গভীর বিষাদ ও হাহাকারে। নীল জলরাশির টানে এসে নোনা পানিতে ভেসে ভেসে নিঃশেষ হয়ে গেল চারটি উদীয়মান তরুণের তাজা প্রাণ।
পেঁচারদ্বীপের হিমছড়ি রেজু খালের মোহনায় বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ সাগরের আগ্রাসী জোয়ারের পানিতে আটকা পড়ে নিখোঁজ হওয়া পাঁচ পর্যটকের মধ্যে আরও এক তরুণের ভেসে আসা মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিস।
বৃহস্পতিবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে সৈকতের বালিমাটিতে নিথর দেহটি ভেসে আসতে দেখেন স্থানীয় অধিবাসীরা। নতুন করে ভেসে আসা মরদেহটি উদ্ধারের পর এ মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারজনে।
বৃহস্পতিবার সকাল দশটার দিকে জোয়ারের ফেনার সাথে সৈকতের পাড়ে ভেসে আসা শরীরটি দেখে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে আসে। সৈকতে জমে থাকা উৎসুক জনতা ও পুলিশের উপস্থিতিতে স্বজনেরা লাশটি সনাক্ত করেন।
প্রাথমিকভাবে নিহত তরুণকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ কবিরের ছেলে মোহাম্মদ হারুন হিসেবে শনাক্ত করেছেন তাঁর শোকস্তব্ধ স্বজনেরা। ছেলেকে হারিয়ে হাসপাতালে এখন বাকরুদ্ধ হারুনের স্বজনেরা।
এর আগে বুধবার বিকেলের শেষ ভাগে হিমছড়ি এলাকার বিখ্যাত মারিনা রিসোর্টের ঠিক পাশের সৈকত প্রাঙ্গণে ঘটে যায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। যেখানে ঘুরতে এসে একসঙ্গে তলিয়ে যান ঢাকা ও চট্টগ্রামের একাধিক পর্যটক।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় ট্রলার মালিক ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকাজে একই দিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ির ২৩ বছর বয়সী তরুণ রোহান এবং একই এলাকার ২৩ বছর বয়সী বন্ধু শহীদুল ইসলাম জিসান।
ঢাকার দুই তরুণের পাশাপাশি একই দিনে উদ্ধার হওয়া তৃতীয় মরদেহটি ছিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ শার্সা এলাকার ২১ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ আকাশের। একসাথে তিন বন্ধুর এমন করুণ বিদায় মেনে নিতে পারছেন না সহপাঠীরা।
বৃহস্পতিবার হারুনের মরদেহ মেলার পরও নিখোঁজের তালিকা পুরোপুরি খালি হয়নি। এখনো উত্তাল সাগরের তোড়ে নিখোঁজ রয়েছেন ঢাকার আজিমপুর এলাকার ২২ বছর বয়সী তরুণ নাফিসুল হক নিবিড়। নিবিড়ের সন্ধানে সৈকতে এখনও কাঁদছেন তাঁর পরিজনেরা।
পেঁচারদ্বীপের পেছনের চরে ঠিক কী ঘটেছিল, তার এক রোমহর্ষক ও করুণ বিবরণ দিয়েছেন স্থানীয় উদ্ধারকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধান করছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসা দুটি পৃথক পর্যটক দল বিকেলে রেজু খালের মোহনায় জেগে ওঠা এক মনোরম বালুচরে ঘুরতে গিয়েছিল।
বাংলাদেশি তরুণদের কাছে হিমছড়ির ওই রেজু খালের মোহনাটি খুবই জনপ্রিয় একটি অ্যাডভেঞ্চার স্পট। তারা রেজু খাল হেঁটে বা ছোট নৌকা নিয়ে পার হয়ে সমুদ্রের মাঝখানে সাময়িকভাবে জেগে ওঠা বালুচরে প্রবেশ করেন।
কিন্তু দূর থেকে দেখতে সুন্দর ও আকর্ষনীয় মনে হলেও বিকেলের দিকে সাগরে যখন পূর্ণ জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন সংকেত বোঝেননি আনন্দে মেতে থাকা পর্যটকেরা। ধীরগতিতে চারপাশের বালি পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে।
আনন্দে মেতে থাকা তরুণরা মোটেও বুঝতে পারেননি যে তারা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক গভীর ফাঁদে আটকা পড়েছেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই খালের পানির তোড় আর সাগরের উত্তাল ঢেউ এসে বালুচরটিকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে।
চারদিক থেকে নোনা পানি ও প্রবল স্রোত ঘিরে ধরলে দুই দলের সদস্যরা একসঙ্গে আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু জোয়ারের পানির গভীরতা ও তোড় এতটাই বেশি ছিল যে কেউ আর সাতরে তীরে ফিরে আসতে পারেননি।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ামাত্র স্থানীয় জেলে, রিসোর্টকর্মী ও গ্রামবাসী স্পিডবোট ও দেশীয় নৌকা নিয়ে দ্রুত অকুস্থলে ছুটে যান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন স্থানীয় অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকেরা।
তারা তাৎক্ষণিকভাবে ভাসতে থাকা চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক দলের তিন সদস্যকে অতিকষ্টে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেন।
জীবিতদের উদ্ধারের পর স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীরা নিখোঁজ বাকিদের খোঁজে রেজু খালের মুখে তল্লাশি চালিয়ে যান। সেখান থেকেই বুধবার বিকেলে পর পর তিন তরুণের নিষ্প্রাণ দেহ উদ্ধার করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে তল্লাশির পরিধি আরও প্রসারিত করা হয়। অবশেষে সকাল দশটার দিকে উদ্ধারকারীরা ভেসে ওঠা চার নম্বর মরদেহ অর্থাৎ মোহাম্মদ হারুনের লাশটি তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ড ও পানিতে ডোবার ঘটনার ভয়াবহতার মধ্যেও তিন তরুণের অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া তিনজন বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে বেঁচে যাওয়া তিন তরুণ হলেন চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার মৃত আবুল কালামের ছেলে রাকিব হাসান, একই এলাকার বাসিন্দা মো. সানী এবং বায়েজিদে বসবাসকারী নোয়াখালীর তরুণ মোহাম্মদ আকাশ।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন সানী ও আকাশ এখনও সেই ভয়াল মুহূর্তের ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি। চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ নিয়ে বুধবারের সেই বিভীষিকাময় বিকেলের বিবরণ শোনান সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের।
তারা জানান, বুধবার দুপুর বারোটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চেপে তারা পর্যটন নগরী কক্সবাজারে নামেন। জীবনের প্রথম এমন আনন্দ ভ্রমণের শুরুতে তারা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলেন।
ট্রেন থেকে নেমে সরাসরি পেঁচারদ্বীপে আগে থেকে বুক করা তাদের পছন্দের একটি রিসোর্টে গিয়ে ওঠেন তিন বন্ধু। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে তারা রেজু খাল পার হয়ে রহস্যময় সেই বালুচরের দিকে পা বাড়ান।
ঠিক একই সময়ে তাদের অজানা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে আসা আরেকটি পর্যটক দলও সেই একই বালুচরে আড্ডা দিচ্ছিল। সবাই যখন ছবি তোলা আর আড্ডায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই সমুদ্র তার ভয়াল রূপ ধারণ করে।
মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে হু হু করে জোয়ারের পানি ঢুকে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সানী জানান, স্রোতের টানে হাত ফসকে বন্ধুরা একে অপরের থেকে দূরে ছিটকে পড়েন।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন সার্বিক উদ্ধার তৎপরতার হালনাগাদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি।
তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া চারজনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে আইনি প্রক্রিয়া ও সুরতহাল প্রতিবেদনের জন্য রাখা হয়েছে। আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আরও জানান, এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ থাকা আজিমপুরের তরুণ নাফিসুল হক নিবিড়ের সন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং কোস্টগার্ডের যৌথ উদ্ধার দল সাগরে নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এটিই প্রথম নয়। বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অপ্রস্তুত অবস্থায় কিংবা জোয়ারের সময় না জেনে সাগরে নামার কারণে প্রতি বছরই ঝরে যাচ্ছে একাধিক তাজা প্রাণ।
বিশেষ করে রেজু খালের মোহনার মতো বিপজ্জনক স্থানগুলোতে কোনো কার্যকর লাল পতাকা বা সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড না থাকাকে দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা তদারকি আরও কড়াকড়ি করার দাবি উঠেছে।
পর্যটন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে পেঁচারদ্বীপ ও রেজু খালের মোহনায় চলাচলে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও লাল নিশান টাঙানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সামনে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্নায় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। প্রিয় সন্তানকে কফিনে নিয়ে বাড়ি ফেরার মতো মর্মান্তিক দৃশ্য কাঁদিয়েছে সাধারণ পথচারীদেরও।
ঢাকার উত্তরা ও চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় নিহতদের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। একসাথে ঘুরতে বের হওয়া একঝাঁক তরুণের এমন কফিনে ফিরে আসা মেনে নিতে পারছে না তাদের পরিবার ও এলাকবাসী।
নিখোঁজ নাফিসুল হক নিবিড়ের পরিবার এখনও অলৌকিক কোনো কিছুর আশায় চেয়ে আছেন সাগরের ফেনিল জলের দিকে। তাদের একটাই আকুতি, অন্তত জীবিত বা মৃত নিবিড়ের শরীরটি যেন দ্রুত উদ্ধার করে তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
কক্সবাজারের মনোরম নীল আকাশ আর বিশাল সমুদ্রের পাশে এই চার তরুণের করুণ মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে কতটা ভয়াল বিপদ। সামান্য অসচেতনতাই ডেকে আনতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নিখোঁজ শেষ পর্যটকের খোঁজ না মেলা পর্যন্ত কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় ডুবুরিদের সমন্বয়ে গঠিত উদ্ধারকারী দল তাদের সমন্বিত অভিযান চালিয়ে যাবে।
উপকূলীয় এলাকার আবহাওয়া ও জোয়ার-ভাটার সঠিক সময়সূচি না জেনে সমুদ্রে নামার এই অসচেতনতা দূর করতে পর্যটন বোর্ডকে আরও বেশি জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। স্থানীয় লাইফগার্ড কর্মীদের সংখ্যা বাড়ানো এবং ড্রোন টহলের ব্যবস্থা করা গেলে এমন অকাল প্রাণহানি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলকে বলা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন রত্ন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং লাইফগার্ডের নজরদারি না থাকলে এমন সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলো দিন দিন শোকের চত্বরে পরিণত হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চায়, এই নির্মম দুর্ঘটনার পর হলেও সৈকতের বিপজ্জনক পয়েন্টগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ও উদ্ধার ব্যবস্থা জোরদার করা হোক।

