ঐতিহাসিক জুলাই সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে জাতীয় রাজনীতির মাঠ আবারও নতুন উত্তাপে মুখরিত হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ও সংবিধান পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে এবার সোচ্চার ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করেছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি ও পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সংগঠনটি। দেশের চলমান সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্থবিরতা এবং সংবিধান সংস্কার ঘিরে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন। এনসিপির মূল বক্তব্য ছিল—জনগণের প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের শাসনতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবে টিকবে না।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর লিখিত বক্তব্য এবং সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
আখতার হোসেন সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট ও গণভোটের রায়কে ঝুঝিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের রায় জনগণ দিয়েছে, তা অবিলম্বে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
এনসিপির উপস্থাপিত প্রথম এবং প্রধান দাবিই হলো গণভোটের রায় অবিলম্বে কার্যকর করা। রাজপথের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে যে সুনির্দিষ্ট রায় দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
দলের দ্বিতীয় দাবিটি ছিল বর্তমানের একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটিকে ঘিরে। এনসিপির স্পষ্ট বক্তব্য, বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন কমিটি কোনো সর্বজনগ্রাহ্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি একপেশে এবং দেশের আপামর মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চরমভাবে ব্যর্থ।
আখতার হোসেন ঘোষণা দেন, বিতর্কিত ও একদলীয় এই সংবিধান সংশোধন কমিটিকে অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করতে হবে। এর পরিবর্তে দেশের সকল অংশীজন, রাজনৈতিক শক্তি এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।
একইসঙ্গে সংবাদ সম্মেলন থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় একটি কৌশলগত রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা হয়। একদলীয় হিসেবে চিহ্নিত ওই সংবিধান সংশোধন কমিটির কোনো বৈঠক বা কার্যক্রমে এনসিপির কোনো প্রতিনিধি অংশ নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়।
আখতার হোসেন দেশের সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এনসিপির অবস্থান নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হলে তা হবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দলটির মূল নীতি হলো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র সংস্কার, কোনো খণ্ডিত বা লোকদেখানো প্রক্রিয়ায় এনসিপি পা দেবে না।
বাংলামোটরের কার্যালয়ে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ একঝাঁক তরুণ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি দলের ভেতরের সুদৃঢ় সংহতি এবং ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক অবস্থানেরই শক্ত জানান দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্য ও যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতাগুলো সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাত, দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এবং অন্যতম যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক। তারা প্রত্যেকেই জুলাই সনদের মূল ভাবধারা অক্ষুণ্ন রাখার ওপর বিশেষভাবে জোর দেন।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তির এই দিনটি নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বছর ঘুরে এলেও সনদের মূল অঙ্গীকারগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
এনসিপি নেতারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেক গোষ্ঠীই তাদের সুবিধাজনক রাজনৈতিক সমীকরণে ফিরে গেছে। কিন্তু যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সংবিধানের স্বপ্ন নিয়ে তরুণ প্রজন্ম রাজপথে জীবন দিয়েছিল, সেই মূল লক্ষ্য এখনও অধরা রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই কঠোর অবস্থান এবং একদলীয় কমিটি বয়কটের সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর এক ধরণের বড় মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি দলের এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান এড়ানো কঠিন হবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধান হতে হবে সব নাগরিকের সুরক্ষার দলিল। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে পুরোনো ভুল ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা কেবল ক্ষমতার হাতবদলের জন্য ছিল না। দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক স্বৈরাচার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক স্বৈরাচারী কাঠামোর চিরস্থায়ী অবসান ঘটানোই ছিল সাধারণ মানুষের মূল তাগিদ।
সংবাদ সম্মেলনে আসা সাংবাদিকরা যখন সরকারের প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন এনসিপি নেতৃবৃন্দ জানান যে তারা রাজপথের আন্দোলন এবং আইনি প্রক্রিয়া—উভয় পথেই তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবেন।
এনসিপির মতে, গণভোটের রায় হচ্ছে জনগণের চূড়ান্ত রায়। এই রায়কে উপেক্ষা করে অন্য কোনো পথে হাঁটলে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংকট তৈরি হতে পারে, যার দায়ভার পুরোপুরি বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তাবে।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, নারী ও তরুণ সমাজের বড় একটি অংশ এই রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপক্ষে রাজপথে নেমেছিল। তাদের সেই আত্মত্যাগকে বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। সঠিক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংবিধান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না।
সালেহ উদ্দিন সিফাত তার বক্তব্যে বলেন, সংস্কারের নামে কোনো ধরনের রাজনৈতিক নাটক সাধারণ মানুষ আর বরদাশত করবে না। সময় এসেছে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা দেশের সকল প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং সংস্কারকামী রাজনৈতিক দলগুলোকে এই দাবির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। দেশের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে এক মঞ্চে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
জুলাই সনদের বর্ষপূর্তিতে এনসিপির দেওয়া এই তিন দফা দাবি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে সরকার এই দাবির মুখে কী ধরনের নমনীয় বা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন নজর পুরো জাতির।
রাজধানীর বাংলামোটর কার্যালয় থেকে আসা এই স্পষ্ট বার্তা পরিষ্কার করে দিল যে, নতুন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের এই কণ্ঠস্বরকে এড়িয়ে গিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান বের করা সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, রাজপথের এই নতুন রাজনীতি কোন মোহনায় গিয়ে মেলে।

