দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া নানা ধোঁয়াশা এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বার্তার প্রেক্ষাপটে এক তীব্র ও তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সোমবার সকালে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে রাজপথের আন্দোলন এবং জাতীয় রাজনীতির স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে নিজেদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর বর্তমান অচলাবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের ধারাবাহিক ভূমিকা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করা হয়। নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত পরিষ্কার ও দৃঢ় ভাষায় ঘোষণা করেন যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি কোনো প্রকার রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে না। বরং সমাজের নানা স্তরে জড়িয়ে থাকা সামাজিক অনাচার, চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদারদের প্রতিহত করতে তারা নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ এককভাবে নির্বাচনের মাঠে লড়াই করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
দেশের মূলধারার রাজনীতির সমীকরণে যখন বিভিন্ন দল জোট গঠন এবং আসন ভাগাভাগির হিসাব কষছে, ঠিক সেই সময়ে এনসিপির এমন একলা চলার ঘোষণা নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নাহিদ ইসলামের মতে, সাধারণ জনগণ এখন পুরোনো ধাঁচের তোষণভিত্তিক রাজনীতি, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির শৃঙ্খল থেকে স্থায়ী মুক্তি চায়। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই অনাচার ও অনিয়মের রাজনৈতিক চক্রের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়ানোকেই এনসিপি তাদের মূল নির্বাচনী অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বারবার স্থগিত ও পিছিয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে কড়া ক্ষোভ ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় এই চিফ হুইপ। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সরকারের মধ্যে এক ধরনের দৃশ্যমান অনিশ্চয়তা তৈরি করা হচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রেখে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমকে থমকে দেওয়ার কোনো চক্রান্ত দেশবাসী কখনোই মেনে নেবে না।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে কারচুপি বা অনিয়মের যেকোনো চেষ্টা নিয়ে এনসিপির অবস্থান যে অত্যন্ত কঠোর থাকবে, তা বেশ জোর দিয়েই পুনর্ব্যক্ত করা হয়। নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সামান্যতম শঙ্কা বা কারচুপির পরিবেশ তৈরি হয়, তবে এনসিপি নীরব দর্শক হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে সেই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে।
কেবল রাজনৈতিক ও নির্বাচনী লড়াইয়ের ঘোষণাতেই সীমিত থাকেনি জাতীয় নাগরিক পার্টির এই জরুরি সংবাদ সম্মেলন। দেশের তরুণ সমাজ ও চাকরিপ্রত্যাশী হাজার হাজার যুবকের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধেও জোরালো কণ্ঠে সোচ্চার হয়েছেন নাহিদ ইসলাম। সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে আড়াই হাজার চূড়ান্ত নির্বাচিত প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তিনি গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
শিক্ষকদের এই বঞ্চনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, যে আড়াই হাজার শিক্ষক প্রার্থীকে অন্যায়ভাবে নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে অবিলম্বে স্ব স্ব পদে চাকরি প্রদান করতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে প্রতিটি যোগ্য মানুষের কাজের অধিকার পাওয়া সাংবিধানিক বিষয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য কারণ ছাড়া এভাবে এক কলমের খোঁচায় হাজার হাজার প্রার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া চরম সামাজিক অবিচার।
প্রার্থীদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, বাদ পড়া এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে যদি কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণিত তথ্য না থাকে, তবে তাদের নিয়োগ আটকে রাখার কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি নেই। অন্যায়ভাবে যদি একটি পরিবারকেও বঞ্চিত করা হয় কিংবা একজন প্রার্থীকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে এনসিপি কেবল রাজপথে নয়, আইনি লড়াইয়েও সেই নির্যাতিত প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়াবে।
সংবাদ সম্মেলনের এক বড় অংশজুড়ে ছিল সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্য ও বৈশ্বিক কূটনীতির এক বিস্তারিত ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সেই ভাষণকে দেশের মানুষের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় দাবির বিপরীতে এক হতাশাজনক উপস্থাপন হিসেবে অভিহিত করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ এই বিশ্বমঞ্চে গণমানুষের মূল চাওয়াগুলোকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বিশ্বমঞ্চে দেওয়া সেই বক্তব্য নিয়ে নিজের গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, জাতিসংঘে দেশের সরকারপ্রধান যে ভাষণ তুলে ধরেছেন, তাতে বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগের কোনো সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি। সেখানে যা বলা হয়েছে, তা মূলত একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সংকীর্ণ এজেন্ডা দ্বারা পরিচালিত ছিল। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো ইতোমধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলোকেই বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্নগুলো জাতিসংঘে উত্থাপন না করাকে সরকারের এক বড় ধরনের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এনসিপি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে বিশ্বের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত হিসেবে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে আমাদের দেশের নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। এত বড় একটি মানবিক ও সার্বভৌমত্বের সংকট থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সীমান্ত হত্যা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের সামনে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
সীমান্ত হত্যার পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তরফ থেকে প্রতিনিয়ত সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনা কিংবা ‘পুশইন’ ইস্যু নিয়ে বিশ্বমঞ্চে কোনো কথা না বলাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করা হয়। বৈশ্বিক ফোরামে সার্বভৌম সীমান্ত সুরক্ষা এবং প্রতিবেশী দেশের অমানবিক আচরণ নিয়ে কথা বলার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছে সরকার। দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষায় সরকারের এমন নীরবতা সাধারণ জনগণের মনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার চরম অভাব নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এনসিপি প্রধান। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা সহিংসতা, ডাকাতি, ছিনতাই এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি প্রশাসনিক অদক্ষতাকে দায়ী করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম পরিষ্কার ভাষায় বলেন, দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নাজুক ও উদ্বেগজনক অবস্থার দায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অবিলম্বে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে জোর দাবি তোলে এনসিপি। নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজ দায়িত্বে বহাল রেখে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি ঘটানো একেবারেই অসম্ভব। সরকারের ভুল নীতি এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার কারণে জনমনে যে ভয় আর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার নিরসনে নতুন ও কার্যকর নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস এবং রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গণআকাঙ্ক্ষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে না পারার বিষয়টিকে বর্তমান নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে যে নতুন রাজনীতির সূচনা হয়েছিল, বিশ্ব দরবারে তা সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায়নি। এমনকি বিগত দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ গণহত্যা এবং শহীদদের ত্যাগের চিত্র জাতিসংঘের মতো মঞ্চে তুলে ধরতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
জাতিসংঘের এই সফর থেকে বাংলাদেশের ঝুলিতে শেষ পর্যন্ত কী অর্জিত হলো, তা এখন দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এক বড় প্রশ্ন। নাহিদ ইসলামের মতে, বৈশ্বিক এই সফর থেকে দেশের জনগণের কোনো প্রকৃত লাভ হয়নি; বরং জাতীয় অর্জন এখানে একেবারেই শূন্য। বিশ্বমঞ্চে দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা কিংবা গণতন্ত্র পুনর্বাসনের বিষয়ে সরকার কোনো স্পষ্ট পথ দেখাতে পারেনি, যা পুরো জাতিকে চরমভাবে হতাশ করেছে।
সার্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে দেশের তরুণ সমাজ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষকে এক ছাতার নিচে আসার আহ্বান জানানো হয়। এনসিপি মনে করে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি আর ক্ষমতা দখলের পুরোনো কৌশল দেশের মানুষকে আর নতুন কোনো স্বপ্ন দেখাতে পারছে না। ফলে নাগরিক অধিকার রক্ষা, তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং চাঁদাবাজমুক্ত একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে এনসিপির এই রাজপথের আন্দোলন আগামী দিনগুলোতে আরও গতিশীল হবে।
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন রাজপথে অব্যাহত রাখার স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে সমাপ্ত হয় এনসিপির এ সংবাদ সম্মেলন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের এই বক্তব্য আগামী দিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির ভূমিকার ওপর এক নতুন মাত্রা যোগ করল। এখন দেখার বিষয়, রাজপথের রাজনীতি ও আসন্ন ভোটের মাঠে এনসিপির এই একলা চলার সিদ্ধান্ত কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে।

