রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয় মঙ্গলবার বিকেলে এক অন্যরকম রাজনৈতিক উত্তাপের সাক্ষী হলো। বিগত গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যখন চারদিকে নানা আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তোপ দাগলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তার সাবলীল অথচ ধারালো বক্তব্যে উঠে এল দেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থবিরতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির নানা গলদ।
অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’। এনসিপির জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক কমিটির আয়োজনে এই সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার বক্তব্যে সরকারের নীতিগত দুর্বলতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের অন্তর্নিহীত রূপ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ফুটে উঠেছে, যা উপস্থিত রাজনৈতিক কর্মী ও সংবাদকর্মীদের মাঝে গভীর রেখাপাত করে।
বক্তব্যের শুরুতে বর্তমান সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে একটি রূপক ব্যবহার করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন যে এই সরকারকে কার্যত একটি ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকের আসনে বসানো হয়েছে। যে গাড়ির না আছে কোনো সচল ইঞ্জিন, না রয়েছে ঠিকঠাক চাকা বা স্টিয়ারিং, তাকে যত দক্ষ চালকই চালানো হোক না কেন, নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব নয়। এই রূপকের মাধ্যমে মূলত তিনি সরকারের প্রশাসনিক অক্ষমতা ও কাঠামোগত দুর্বলতাকেই সবার সামনে তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল, তা আজ অনেকাংশেই হোঁচট খাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এই এনসিপি নেতা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কেবল ক্ষমতার চেয়ারগুলোর মালিকানা বদল হয়েছে। কেউ হয়েছেন মন্ত্রী, কেউ প্রতিমন্ত্রী, আবার কেউ বা সংসদ সদস্য। ব্যক্তিগতভাবে কিছু মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরলেও সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রকাঠামোয় চুল পরিমাণ পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন তিনি।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এমন একটি অকার্যকর ও যান্ত্রিক ত্রুটিতে ভরা গাড়ির চালকের আসনে তাকে বসানো হয়েছে। চালক যতই অভিজ্ঞ বা চৌকস হোন না কেন, গাড়ির ভেতরের যন্ত্রাংশ অকেজো থাকলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অবাস্তব। সংস্কারের বদলে সরকার এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দলীয় পুনর্বাসনেই বেশি ব্যস্ত রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
রাজনীতির অন্দরমহলে একধরনের অদ্ভুত বৈপরীত্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন যে বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারী দল আওয়ামী লীগের একধরনের অদৃশ্য সম্পর্কের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মুখে জুলাইয়ের চেতনা আর অন্তরে আওয়ামী প্রীতি—এমন দ্বিমুখী অবস্থান দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম অস্বস্তির জন্ম দিচ্ছে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যারা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, সেই পরীক্ষিত তৃণমূল নেতাকর্মীরা আজ কোণঠাসা।
অন্যদিকে, ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই বিএনপিতে ভিড়ে যাওয়া নতুন একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছে। এরা কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে না, বরং বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসা ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। দীর্ঘদিনের নির্যাতিত কর্মীদের এই বঞ্চনা দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন এনসিপির এই শীর্ষ সংগঠক।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বর্তমান তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার বা ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ না করেই ঢালাওভাবে শত শত মানুষকে মামলার আসামি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে এসব ঢালাও মামলাকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য অর্থ আদায় এবং আপস-বাণিজ্যের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পুলিশি তদন্তের স্থবিরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দেশের বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন যে এত মামলা হওয়ার পরও প্রকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে কটি অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা পড়েছে? মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে অপরাধীদের বাঁচানোর একটি সুক্ষ্ম চক্রান্ত চলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চার্জশিট দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জোর দাবি জানান তিনি।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সরকারের প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কঠোর সমালোচনা করেন হাসনাত। সরকার মুখে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বললেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৩.৪২ শতাংশে। দেশের বর্তমান বাস্তব অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরকারের এই দাবির কোনো বাস্তব মিল নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মসংস্থান ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলেন এই তরুণ রাজনৈতিক নেতা। সাধারণ বেকার যুবকদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিক পরিবারগুলোর প্রভাবশালী সদস্যরা ঠিকাদারি কাজ, সার ও অন্যান্য পণ্যের ডিলারশিপ লুটে নিচ্ছে। দুর্নীতির এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে দেশের অর্থনীতি কোনো দিনই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না বলে সতর্ক করে দেন তিনি।
সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন যে মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফুলেফেঁসে উঠছেন। বিশেষ করে তার ছেলের শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে হঠাৎ করে বড় বড় ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানাবিধ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে এমন পারিবারিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে স্পষ্ট জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বিচার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন যে দল হিসেবে ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কেবল গুটিকয়েক নেতার বিচার করলেই চলবে না, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যে অপরাধ করেছে, তা রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করাতে হবে। কোনো ধরনের অপরাধের অনুশোচনা না করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যেকোনো আলোচনা দেশের শহীদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন যে ন্যাশনাল পার্টির রাজনৈতিক পরিণতি যেভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, বাংলার মাটিতেও আওয়ামী লীগের বিচার সেই পথেই হওয়া উচিত। পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং আদালতের রায় কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জানান তিনি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের এই লড়াই কোনোভাবেই থামবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিএনপির নির্যাতিত ও অবহেলিত তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিশেষ বার্তা দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন যে দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা ক্ষমতার সুফল ভোগ করলেও মাঠের কর্মীরা আজও পুরোপুরি বঞ্চিত ও উপেক্ষিত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এবং দলের ভেতরের অসৎ চক্রকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান তিনি। জনগণের মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের এই লড়াইয়ে আপসীন থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এনসিপির এই আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘটে।

