মিরপুরের তপ্ত দুপুরের রোদের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন উদ্বিগ্ন মায়েরা, তাদের কোলে সদ্যোজাত কিংবা কয়েক মাসের শিশু। যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে তারা ছায়ার অপেক্ষা করছেন, সেটি কোনো খোলা প্রান্তর নয়। এটি মিরপুর-১ এলাকার সুপরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের প্রাঙ্গণ। কিন্তু আজ সেখানে কোনো সুশৃঙ্খল অপেক্ষাগার নেই, নেই চিকিৎসকদের বসার সুনির্দিষ্ট কোনো কক্ষ। চারদিকে কেবল ইট-পাথরের ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা কাচ আর লুটের ক্ষতচিহ্ন।
গত ৫০ বছর ধরে এই এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আস্থার এক বিশাল প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টার নজিরবিহীন তাণ্ডব, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর জায়গাটি পরিণত হয়েছে এক বিরানভূমিতে। ভবনটি ধ্বংস করে দেওয়া হলেও জীবন রক্ষাকারী সেবা থেমে নেই। স্বাস্থ্যকর্মীরা মাথার ওপর কোনো ছাদ ছাড়াই, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে শিশুদের টিকাদানের মতো অত্যন্ত জরুরি সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রোববার দুপুরে এই ধ্বংসস্তূপ সরেজমিনে পরিদর্শন করতে আসেন জনপ্রিয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ইনফ্লুয়েন্সার ডা. তাসনিম জারা। ইট-সুরকির ওপর দিয়ে হেঁটে পুরো এলাকাটি ঘুরে দেখার পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি। তার চোখেমুখে ছিল স্পষ্ট ক্ষোভ এবং কণ্ঠে ছিল প্রশাসনের প্রতি একরাশ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই তাণ্ডবের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ডা. তাসনিম জারা সাংবাদিকদের সামনে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর হওয়া মানে কেবল ইটের দেয়াল ভেঙে পড়া নয়, এটি হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ভাঙচুর ও তাণ্ডব কোনো পাঁচ-দশ মিনিটের ঘটনা ছিল না। কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রকাশ্যে এই ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে।
পুলিশকে যথাসময়ে এই হামলার বিষয়ে জানানো হয়েছিল বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাসনিম জারার প্রশ্ন, প্রশাসন জানার পরও কেন এই তাণ্ডব মাঝপথে থামানো গেল না? দিনের আলোতে একটি স্বনামধন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে যদি এমন লুটপাট চলতে থাকে এবং পুলিশ যদি তা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোন ভরসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে তাকাবে? রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবলয়ের এই মারাত্মক ছিদ্রটি সাধারণ নাগরিকদের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।
এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কেবল শিশুদের টিকাদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রসূতি মায়েদের নিয়মিত চেকআপ, গর্ভবতী নারীদের আল্ট্রাসনোগ্রাফি, পুষ্টিবিষয়ক কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে বয়স্কদের নানা ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো এখান থেকে। তাসনিম জারা উল্লেখ করেন, ভবন ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার পরও মায়েরা কাঠফাটা রোদের মধ্যে কষ্ট করে তাদের সন্তানদের টিকা দিতে নিয়ে আসছেন। এটি প্রমাণ করে, এই কেন্দ্রটির ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরতা ও আস্থা ঠিক কতটা গভীর।
তবে এই হামলাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ভবনের ওপর আক্রমণ বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেন এই চিকিৎসক। তিনি এই ঘটনার শেকড় খুঁজতে গিয়ে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকে আঙুল তোলেন। দেশজুড়েই বর্তমানে জমি দখল, বাড়ি দখল এবং সাধারণ মানুষের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের এক ভয়াবহ মহোৎসব চলছে, যার শিকার হয়েছে এই রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিও।
ডা. জারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের দখলদারিত্বের অভিযোগের তীর অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধেও উঠছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর কেন তৃণমূল পর্যায়ে জমি বা প্রতিষ্ঠান দখলের এমন একটি অসুস্থ ও আগ্রাসী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মানে যে সাধারণ মানুষের সম্পত্তি লুটপাটের লাইসেন্স নয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ভাঙচুরের ফলে স্বাস্থ্যসেবায় যে দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার একটি ভয়াবহ চিত্রও উঠে আসে তাসনিম জারার বর্ণনায়। লুটপাটের সময় দুর্বৃত্তরা কেবল চিকিৎসা সরঞ্জামই নিয়ে যায়নি, তারা শিশুদের টিকাদানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার খাতা, হাসপাতালের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত দুটি আধুনিক ট্যাব এবং অফিসের যোগাযোগের মূল ফোনটিও চুরি করে নিয়ে গেছে। একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের জন্য এর চেয়ে বড় বিপর্যয় আর কিছু হতে পারে না।
আগে স্বাস্থ্যকর্মীরা এই রেজিস্টার খাতা দেখে এবং অফিসের ফোন ব্যবহার করে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কোন শিশুর কবে কোন টিকার ডোজ পাওনা রয়েছে, তা মনে করিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সব তথ্য হারিয়ে যাওয়ায় কর্মীরা বাধ্য হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটি একদিকে যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি অসম্পূর্ণ একটি প্রক্রিয়া।
তাসনিম জারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, এই তথ্য হারানোর ফল হতে পারে ভয়াবহ। নিম্ন আয়ের অনেক মা-বাবাই হয়তো দৈনন্দিন জীবনের চাপে শিশুদের টিকা কার্ডটি হারিয়ে ফেলেছেন। আগে রেজিস্টার থাকায় কেন্দ্র থেকে সেটি পুনরায় বের করা সম্ভব হতো। এখন যেহেতু কোনো রেকর্ড নেই, তাই নিয়মিত টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
টিকাদানের এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে ভবিষ্যতে সমাজে পোলিও, হাম বা ডিপথেরিয়ার মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নতুন করে ফিরে আসার এক বিশাল শঙ্কা তৈরি হবে। তাই তিনি সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রেজিস্টার পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি শিশুর টিকার তথ্য পুনরায় সংগ্রহ করে একটি নতুন ডাটাবেজ তৈরি করা এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেই অপরিহার্য।
ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি মাতৃস্বাস্থ্যসেবার বর্তমান শোচনীয় অবস্থার কথাও তুলে ধরেন। গর্ভবতী মায়েদের জন্য যে ছায়াযুক্ত ও নিরিবিলি অপেক্ষাগার ছিল, সেটি এখন ধ্বংসস্তূপ। আগে যেখানে শিশুরা একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ছায়াযুক্ত কক্ষে বসে স্বাচ্ছন্দ্যে টিকা নিত, সেখানে এখন তাদের মায়েরা বাধ্য হচ্ছেন খোলা রোদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে। প্রচণ্ড ভিড়, রোদ এবং বসার জায়গা না থাকায় অনেক অভিভাবকই বাধ্য হয়ে শিশুদের টিকা না দিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
একই সঙ্গে গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো হতো, তা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রসূতি মায়েদের জন্য যে বিশেষ চেকআপ এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা ছিল, কক্ষের অভাবে এবং যন্ত্রপাতির অভাবে সেটিও এখন পুরোপুরি স্থবির। একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য এই নিয়মিত চেকআপ কতটা জরুরি, তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামান্যতম জ্ঞান থাকা যে কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব। অথচ দখলদারদের লালসার কারণে আজ শত শত মায়ের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তাসনিম জারা পুরো ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনটি ঘুরে দেখেছেন। তিনি জানান, পুরোটাই যে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, বিষয়টি তেমন নয়। ভবনের বেশ কিছু কক্ষ এখনো কাঠামোগতভাবে অক্ষত এবং ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা বা নিরাপত্তার অজুহাতে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রশাসন যদি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এই ব্যবহারযোগ্য কক্ষগুলো খুলে দেয়, তবে অন্তত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের টিকাদানের মতো সংবেদনশীল কাজগুলো আবার একটি ছাদের নিচে শুরু করা সম্ভব হবে।
সেবাগ্রহীতাদের পাশাপাশি যারা নিরলসভাবে এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবেতর অবস্থার কথাও অত্যন্ত সহমর্মিতার সঙ্গে তুলে ধরেন তিনি। এই নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়েও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অথচ বর্তমানে তাদের জন্য ন্যূনতম কোনো কর্মপরিবেশ অবশিষ্ট নেই। সারাদিন কাজ করার পর তাদের একটি পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম ব্যবহার করার সুযোগ নেই, নেই দুপুরে একটু বসে খাবার খাওয়ার মতো কোনো নির্দিষ্ট জায়গা।
এমন অমানবিক পরিবেশে কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর পক্ষেই দীর্ঘ দিন ধরে সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাসনিম জারা মনে করেন, সেবা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এই কর্মীদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা জরুরি। অন্তত তাদের প্রাথমিক মানবিক চাহিদাগুলো যেন পূরণ হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত।
পরিশেষে তিনি স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতি একটি সম্মিলিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানান। ব্যবহারযোগ্য কক্ষগুলো দ্রুত খুলে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এবং টিকাদানের মতো জরুরি সেবাকে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন রাখার জন্য তিনি জোর দাবি তোলেন। একটি সভ্য সমাজে চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো পবিত্র স্থানে হামলা ও লুটপাট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কেন্দ্রটির দ্রুত সংস্কারই এখন মিরপুরবাসীর একমাত্র দাবি।

