গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারী লোহার ফটকটি যখন মঙ্গলবার বিকেলে সামান্য ফাঁক হলো, তখন বিকেলের হেলে পড়া রোদের আলো এসে পড়েছিল কারাপ্রাঙ্গণে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের বন্দিজীবন শেষে আবার মুক্ত বাতাসের স্পর্শ পেলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক।
বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে তিনি কারাগারের মূল ফটক পেরিয়ে বাইরে আসেন। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন তার কয়েকজন আইনজীবী, নিকটাত্মীয় ও গণমাধ্যমকর্মী। গাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার সময় তার পোশাকে ও অবয়বে ছিল দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং কারাবাসের স্পষ্ট ক্লান্তি।
একটি প্রতারণা মামলায় বিচারিক আদালত কর্তৃক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন বিদিশা সিদ্দিক। সাজা পরোয়ানাভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিনের আদেশ মেলায় অবশেষে তার এই সংক্ষিপ্ত বন্দিদশার অবসান ঘটল।
কারাগার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালের দিকেই বিদিশা সিদ্দিকের জামিন সংক্রান্ত আদালতের মূল নথিপত্র গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে এসে পৌঁছায়। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় ধারাবাহিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া।
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সিনিয়র জেল সুপার মো. নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঢাকা থেকে আসা জামিনের কাগজপত্র এবং আদালতের আদেশের অনুলিপি নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ নথিপত্রের সঠিকতা ও আইনি বৈধতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিকেলের মধ্যেই সব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করে বিদিশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এই আইনি ট্র্যাজেডি ও কারাবাসের সূচনা হয়েছিল গত ২৫ আগস্ট রাতে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় অবস্থানকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে বা নজরদারির বাইরে থাকার পর ওই রাতে তাকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারের পরদিন, অর্থাৎ ২৬ আগস্ট সকালে বিদিশাকে কড়া নিরাপত্তায় ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে তার আইনজীবীরা শারীরিক অসুস্থতা ও সামাজিক মর্যাদার অজুহাতে জামিনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন।
তবে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শুনানি শেষে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের সেই আদেশের পরই তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, বিদিশা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ী প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
রায়ের সময় বিদিশা সিদ্দিক আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। সেই পরোয়ানার ধারাবাহিকতাতেই গুলশানের রেস্তোরাঁ থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
কারাগারে কাটানো এই ১৪ দিন সম্পর্কে কারা কর্মকর্তা ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, বিশেষায়িত এই নারী কারাগারে তাকে সাধারণ বন্দিদের মতোই রাখা হয়েছিল। তবে তার শারীরিক অবস্থা ও বয়স বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
কারাবাসকালে বিদিশার আইনজীবীরা তাকে নিয়মিত আইনি পরামর্শ দিয়েছেন। উচ্চ আদালতে সাজার বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করার পাশাপাশি জরুরি জামিনের আবেদন করা হয়। সেই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে উচ্চ আদালত তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিদিশা সিদ্দিক একটি অত্যন্ত পরিচিত ও আলোচিত নাম। সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই তিনি ব্যাপক আলোচনায় উঠে আসেন।
এরশাদের পতনের পরবর্তী সময়ে এবং তার রাজনৈতিক জীবনের নানা ওঠাপড়ার সঙ্গে বিদিশার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। জাতীয় পার্টির রাজনীতি, পারিবারিক সম্পত্তি ও ট্রাস্ট গঠন নিয়ে তাদের মধ্যকার মতবিরোধ বারবার পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয়েছে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর তাদের একমাত্র সন্তান এরিক এরশাদের দেখাশোনা ও ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদিশা সিদ্দিক রাজপথে ও আদালতে সক্রিয় অবস্থান নেন। এমনকি নিজেকে জাতীয় পার্টির মূলধারার সংগঠক হিসেবে দাবি করে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের চেষ্টাও করেছিলেন।
তবে সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মাঝেই এই সাজা ও গ্রেপ্তার তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের ওপর বড় ধরনের একটি ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়। একজন প্রভাবশালী নারী ব্যক্তিত্বের এমন সাজা ও কারাবাস দেশের উচ্চবিত্ত ও রাজনীতি সচেতন মহলকে চমকে দিয়েছিল।
মঙ্গলবার বিকেলে জামিনে বের হওয়ার সময় বিদিশার পরনে ছিল সাধারণ পোশাক। গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিক্রিয়া জানার জন্য মাইক বাড়িয়ে দিলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তার চেহারায় স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।
তার আইনজীবী দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। জামিন পাওয়াটা আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ হলেও মূল আপিল শুনানি এখনো বিচারধীন রয়েছে।
আইনজীবীদের দাবি, এই মামলাটি একটি ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে সৃষ্ট এবং এতে বিদিশাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হয়েছিল। উচ্চ আদালতে শুনানির সময় তারা বিদিশার পূর্ণাঙ্গ খালাসের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করবেন বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
কাশিমপুর কারাগারের বাইরে মঙ্গলবার দুপুর থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। বিদিশার অনুসারী এবং কৌতূহলী জনতার ভিড় এড়াতে পুলিশ কারাফটকের সামনে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
কাগজপত্র যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে মুক্তিতে কিছুটা বিলম্ব হলেও সাড়ে পাঁচটার দিকে তাকে বহনকারী কালো রঙের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কারাগারের সীমানা প্রাচীর অতিক্রম করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়।
তার পারিবারিক ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, কারামুক্তির পর বিদিশা সরাসরি তার রাজধানীর বারিধারার বাসভবনে চলে যান। দীর্ঘ ১৪ দিনের কারাবাসের পর তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ ক্লান্ত, তাই আপাতত কিছুদিন চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে থাকবেন।
একই সঙ্গে মা ও সন্তানের বিচ্ছেদ ঘটেছিল এই দুই সপ্তাহে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান এরিক এরশাদের কাছে ফিরে যাওয়াই এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন তার নিকটজনেরা। মায়ের অনুপস্থিতিতে এরিকের চিকিৎসা ও দেখাশোনা নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন তারা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালতের সাজা প্রাপ্ত হওয়ার পরও উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়া বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক নিয়ম। তবে এটি সাজা মওকুফ নয়, আপিল নিষ্পত্তির সময় পর্যন্ত তিনি মুক্তভাবে অবস্থান করতে পারবেন মাত্র।
আগামী দিনে বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় এই আপিল শুনানি কীভাবে এগোবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিদিশা সিদ্দিকের দীর্ঘমেয়াদী আইনি ভবিষ্যৎ। আদালত যদি সাজার রায় বহাল রাখেন, তবে তাকে পুনরায় শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে বিদিশার মুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আদালতের রায় ও প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানো উচিত। আবার অনেকে তার দ্রুত জামিন পাওয়াকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ পরিবারের নানা অধ্যায় যেভাবে সময়ের সঙ্গে নাটকীয় মোড় নিয়েছে, বিদিশা সিদ্দিকের এই কারাবাস ও মুক্তি যেন তারই আরেকটি নতুন সংযোজন। দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর এই অভিজ্ঞতা তার জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করল।
ঢাকা-গাজীপুর মহাসড়কের যানজট পেরিয়ে বিদিশাকে বহনকারী গাড়িটি যখন রাজধানীর সীমানায় প্রবেশ করে, তখন বারিধারার বাসভবনে অপেক্ষা করছিলেন তার স্বজনরা। আইনি লড়াইয়ের এই প্রথম ধাপে জয়ী হয়ে ঘরে ফেরার মধ্য দিয়েই আপাতত সমাপ্তি ঘটল কাশিমপুর কারাগারের এই ১৪ দিনের বন্দি অধ্যায়ের।

